মানবপাচার বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘ দিনের সঙ্কট। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, বৈষম্য ও নিরাপদ অভিবাসনের অভাবে প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ পাচারকারী চক্রের ফাঁদে পড়ে। এতে সর্বস্ব হারাতে হয় তাদের। অনেক ক্ষেত্রে জীবনও দিতে হয়। এই প্রেক্ষাপটে মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ দমন অধ্যাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

অধ্যাদেশে সঙ্ঘবদ্ধ মানব পাচারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। একই সাথে অভিবাসী চোরাচালানের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। শাস্তির এই কঠোরতা নিঃসন্দেহে একটি শক্ত বার্তা দেয়। এখন থেকে মানবপাচারের মতো গুরুতর অপরাধ আর সহনশীল চোখে দেখবে না রাষ্ট্র। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রের বিরুদ্ধে এটি দৃঢ় আইনি অস্ত্র হতে পারে।

তবে শাস্তি যত কঠোরই হোক, এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে সঠিক তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার ও আইনের ন্যায়সঙ্গত প্রয়োগের ওপর। কেবল দণ্ডের মাত্রা বাড়ালেই অপরাধ কমে না। এর জন্য দরকার আইনের কঠোর প্রয়োগ। এই অধ্যাদেশ বাস্তবায়নে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর দক্ষতা, জবাবদিহি এবং দুর্নীতিমুক্ত কার্যক্রম নিশ্চিত করা জরুরি।

অধ্যাদেশের বড় একটি ইতিবাচক দিক হলো, ভিকটিমের পরিচয় সুরক্ষার বিধান। ট্রাইব্যুনালের অনুমতি ছাড়া মানবপাচার বা অভিবাসী চোরাচালানের শিকার ব্যক্তির নাম, ছবি বা পরিচয় প্রকাশকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এটি ভিকটিমের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সাথে গণমাধ্যমকেও আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের বার্তা দেয়। তবে খেয়াল রাখতে হবে, এই বিধান যেন সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।

অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, মানবপাচার বা অভিবাসী চোরাচালানের অভিযোগ থানায় বা ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা যাবে। তদন্তের নির্দেশ পাওয়ার পর ৯০ দিনের মধ্যে এর তদন্ত শেষ করতে হবে। এই সময়ের মধ্যে শেষ করতে না পারলে যুক্তিসঙ্গত কারণ উল্লেখ করে সময়সীমা আরো ৪৫ দিন বাড়াতে পারবে ট্রাইব্যুনাল। অভিযোগ গঠনের ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে ট্রাইব্যুনালকে বিচার শেষ করতে হবে।

৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করা এবং ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করার বাধ্যবাধকতা প্রশংসনীয়। দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে দ্রুত বিচার নিশ্চিত হলে ভিকটিম ন্যায়বিচার পাবেন। অপরাধীদের জন্য এটি হবে কার্যকর প্রতিবন্ধক।

বেঁধে দেয়া সময়সীমার মধ্যেই যেন তদন্ত শেষ হয়, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকা জরুরি। তদন্ত সংস্থার কার্যকারিতা বাড়িয়ে নিয়মিতভাবে এই সময়সীমা মানার ব্যবস্থা করতে হবে।

অধ্যাদেশে মিথ্যা মামলার জন্য শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এই বিধান অপব্যবহার রোধে সহায়ক হতে পারে; কিন্তু প্রয়োগের ক্ষেত্রে যেন প্রকৃত ভিকটিমরা ভয় পেয়ে অভিযোগ করতে নিরুৎসাহিত না হন, সে বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।

২০১২ সালের আইন রহিত করে নতুন এই অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছে। এটি একটি বড় পদক্ষেপ; কিন্তু মনে রাখতে হবে, মানবপাচার কেবল আইন দিয়ে ঠেকানো যাবে না। দারিদ্র্যবিমোচন, নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের সুযোগ বাড়াতে হবে। মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। ভিকটিমদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। মোট কথা, সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া কেবল কাগজে-কলমের আইন বাস্তবে ফল দেবে না।

এই অধ্যাদেশ যেন কেবল কঠোর শাস্তির ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং সত্যিকার অর্থেই মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান দমনে মাইলফলক হয়ে ওঠে, এটিই প্রত্যাশা।