জ্বালানি সরবরাহ ও মজুদ নিয়ে দেশে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। সরকারের হিসাবপত্রে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই। সরবরাহ ব্যবস্থায়ও কোনো ধরনের জটিলতা নেই। এ দিকে গ্রাহকরা জ্বালানি সংগ্রহ করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন। সারা দিন লাইনে দাঁড়িয়ে প্রয়োজনীয় তেল সংগ্রহ করতে পারছেন না। জ্বালানি সংস্থান করতে না পেরে গাড়ি চালানো বন্ধ রাখতে হচ্ছে। সড়কে এর প্রভাব দৃশ্যমান। এ অবস্থায় সরকার জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে। এবার এর নেতিবাচক প্রভাব সব খাতে পড়বে।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ এক বিজ্ঞপ্তিতে প্রধান চারটি জ্বালানির নতুন দাম নির্ধারণ করেছে। লিটার-প্রতি অকটেনের দাম ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০, পেট্রল ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫, ডিজেল ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ এবং কেরোসিন ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা করা হয়েছে। গতকাল রোববার থেকে সরকারি দাম কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত জ্বালানি ডিজেল। এর দাম ১৫ শতাংশ বেড়েছে। অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি শিল্প বিদ্যুৎ এবং পরিবহন মূলত ডিজেলনির্ভর। জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাব তাই বিস্তৃত পরিসরে পড়বে।
অতীতে দেখা গেছে, জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের সময় সব স্তরে সমতা রক্ষা হয়নি। এবারো সেই লক্ষণ স্পষ্ট। অসাধু চক্র এর থেকে অবৈধ সুযোগ হাতিয়ে নেয়। এ অবস্থায় উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে বাজারে পণ্যের দামে নতুন করে আরেক দফা বাড়বে। নিত্যপণ্য বিশেষত খাদ্যমূল্যের ওপর এর তীব্র প্রভাব পড়বে। যেকোনো সঙ্কটে সহজ শিকারের নিশানা হন নিম্ন-আয়ের মানুষ।
এ দিকে দাম বাড়ানোর আগে ডিজেল সরবরাহ ঘাটতিতে আমাদের পোশাকশিল্প কারখানা আক্রান্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে তৈরী পোশাক উৎপাদন ক্ষমতা এক-চতুর্থাংশ কমে গেছে। তার চেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে কৃষি খাতে। কৃষকরা সেচকাজ চালাতে পারছেন না ডিজেলের অভাবে। সরকারি হিসাবে ডিজেলের মজুদ আছে এক লাখ দুই হাজার টন। মাসে ডিজেলের চাহিদা চার লাখ টন। সরকারের দেয়া তথ্যমতেÑ বন্দরে খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে এক লাখ টন। এর বাইরে ৮০ হাজার টন জরুরি মজুদ রয়েছে। সেই হিসাবে ডিজেল ঘাটতির আশঙ্কা নেই বলা যায়। বাস্তবতা হচ্ছে, প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রাহকরা ডিজেলের সরবরাহ পাচ্ছেন না।
একই অবস্থা অকটেন এবং পেট্রলের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে। এ দুটোর মধ্যে পেট্রল শতভাগ দেশে উৎপাদিত হয়, অন্য দিকে অকটেনের ৫০ শতাংশ দেশে উৎপাদিত হয়। সরকারি হিসাবে এ দুটোর সরবরাহ ও মজুদে কোনো ঘাটতি নেই। বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে- ফিলিং স্টেশনে মাইলের পর মাইল লম্বা লাইন পড়েছে। অনেকে সারা দিন অপেক্ষা করেও গাড়ির প্রয়োজনীয় অকটেন-পেট্রল সংগ্রহ করতে পারছেন না। অনেক ফিলিং স্টেশনে নোটিশ ঝুলছে- অকটেন নেই। সরকারের দেয়া তথ্য এবং বাজারের বাস্তবতার মধ্যে এই ফারাকের হেতু কী, সেটি সরকারকে স্পষ্ট করতে হবে। অন্যথায় জটিলতা আরো বাড়বে। পরিস্থিতির আরো অবনতি হবে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে অতীতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম মাত্রাতিরিক্ত বাড়ানো হয়েছে; এবারো সেই একই ধরনের পাঁয়তারা হতে পারে। বিষয়টির প্রতি সরকারের সতর্ক নজর রাখতে হবে।