দেশ আজ মাদকে সয়লাব। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মাদকের বিস্তার তরুণ, যুবক থেকে শুরু করে নানা শ্রেণিপেশার মানুষকে কুরে কুরে খাচ্ছে। ফ্যাসিবাদী শাসনে দেশ অনেকটা মাদকের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়। সে সময় কিছু এমপির বিরুদ্ধেও মাদক কারবারে জড়ানোর অভিযোগ ওঠে। তখন এ নিয়ে কথা বলা ছিল অসম্ভব। শেখ হাসিনার সরকার সব জেনে-শুনেও ছিল অনেকটা নীরব।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সম্প্রতি জাতীয় সংসদে মাদকের বিরুদ্ধে আলোচনা মানুষকে আশাবাদী করছে। বিশেষ করে মাদক মামলার বিচারে পৃথক আদালত গঠনের জন্য যে সংশোধনী বিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এনেছেন, তা আশাব্যঞ্জক।
সংসদে এ-সংক্রান্ত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মাদক-সংক্রান্ত অপরাধ সামাজিক কাঠামো ও জননিরাপত্তার জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকিতে পরিণত হয়েছে। এর মোকাবেলায় পৃথক ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দ্রুত ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করা আবশ্যক। মাদকাসক্তি ও মাদক-সংক্রান্ত অপরাধের প্রভাবে মাদকসেবীরা খুন, ধর্ষণ, চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতিসহ নানাবিধ গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে। সাধারণ আদালতে বিদ্যমান মামলার চাপে মাদক-সংক্রান্ত অপরাধের বিচারে কাঙ্ক্ষিত গতি আনা যাচ্ছে না। মাদক-সংক্রান্ত অপরাধের বিচার ত্বরান্বিত, কেন্দ্রীভূত ও ফলপ্রসূ করতে বিদ্যমান আইন সংশোধন সময়ের দাবি। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে, এখতিয়ারসম্পন্ন সাধারণ আদালতে বিচারের বিধান অক্ষুণ্ন রেখে মাদক অপরাধপ্রবণ এলাকায় ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার বিধান সংযোজন করা হচ্ছে। ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার ফলে মাদক-সংক্রান্ত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত হবে। মাদকদ্রব্যসংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ রোধে নতুন বিধান সংযোজন করা হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় মাদকপাচার প্রতিরোধ, অভিযান পরিচালনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরকে আগ্নেয়াস্ত্রের প্রাধিকার ও ডগস্কোয়াড গঠনের বিধান সংযোজন করা হয়েছে।
মাদক কারবারের সাথে কারা জড়িত আর কোন পথে কিভাবে দেশে মাদক প্রবেশ করে তা সরকারি বাহিনীগুলোর অজানা নয়; কিন্তু অজানা কারণে মাদক চোরাচালানের রুটগুলো নিয়ন্ত্রণ করা হয় না। মাদক কারবারের সাথে জড়িত রাঘববোয়ালদের গ্রেফতার করে শাস্তির আওতায় আনার দৃষ্টান্ত খুবই বিরল। কাউকে গ্রেফতার করা হলেও নিশ্চিত প্রমাণের অভাবে অথবা আইনের ফাঁকফোকরে দ্রুতই তারা জামিনে বেরিয়ে আসে। শাস্তি পায় চুনোপুঁটিরা। আইনগত এসব দুর্বলতা চিহ্নিত করে আইনটি জোরদার করতে হবে। ঢাকা শহরে লাইসেন্সবিহীন সিসা বারে অবাধে মাদকের কারবার চলছে। কিন্তু সে বিষয়ে ঢাকার পুলিশ প্রশাসন একরকম নীরব। এসব লাইসেন্সবিহীন বার বন্ধ করতে হবে। মাদক নিয়ন্ত্রণ সরকারের একার পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়। এ জন্য কমিউনিটিভিত্তিক কার্যক্রম নেয়া যেতে পারে। পাড়ায়-মহল্লায় স্থানীয় জনগণকে নিয়ে মাদকবিরোধী কমিটি গঠন করা হলে তা সুফল দিতে পারে। এসব কমিটির সহায়তায় প্রশাসন মাদকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে।
অনাদর অবহেলা কিংবা পিতা-মাতার অসচেতনতায় বেড়ে ওঠা শিশুদেরই মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ার আশঙ্কা বেশি। তাই শিশু-কিশোরদের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে অভিভাবক, সমাজ ও রাষ্ট্রকে আরো বেশি যত্নশীল হতে হবে। প্রতিটি শিশুকে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। শুধু আইন করে মাদক নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব।