আমাদের দেশে খাদ্যনিরাপত্তা তেমন টেকসই নয়। বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো তিন বেলা খাবার পান না। অথচ দেশে উৎপাদিত শস্যের এক-তৃতীয়াংশ অপচয় হয়। এ এক নীরব অথচ গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা।

গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ফসল তোলার পর ৮-১৫ শতাংশ চাল এবং ২০-৪০ শতাংশ ফল ও সবজি নষ্ট হয়। যার আর্থিক মূল্য ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ সবজি, মাছ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের উৎপাদনে অগ্রণী দেশ হওয়ার পরও সংরক্ষণ ব্যবস্থার অপ্রতুলতায় সেগুলোর একাংশ নষ্ট হয়ে যায়। পরে সেই পণ্য আমদানি করতে হয়। এটি কৃষক এবং অর্থনীতি উভয়ের জন্য একটি সুযোগের অপচয়।

তথ্যমতে, বিশ্বে উৎপাদিত খাদ্য মোট জনসংখ্যার দেড় গুণের বেশি মানুষ খাওয়াতে যথেষ্ট। তবু অসম বণ্টন, দুর্বল অবকাঠামো এবং অপচয়ের কারণে বিশ্বে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও অপুষ্টি রয়ে গেছে। উদ্বৃত্ত থাকার পরও খাদ্য অপচয় হওয়ায় অভাবী মানুষ খাবার পায় না।

পরিসংখ্যান বলছে, আমাদের দেশে উৎপাদিত খাদ্যের প্রায় ৩৪ শতাংশ নষ্ট বা অপচয় হয়। এর ফলে অর্থনৈতিক, পরিবেশগত এবং সামাজিক ক্ষেত্রে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ২৭ শতাংশ জমি এমন খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়, যা কখনো খাওয়া হয় না। এর ফলে ১৩ শতাংশ গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গত হয়। যার আর্থিক মূল্য দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের বা জিডিপির ৪ শতাংশের সমান। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি বলছে, নষ্ট হওয়া খাদ্যের আর্থিক মূল্য ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), ঢাকায় অবস্থিত রয়েল ড্যানিশ দূতাবাস, জাতিসঙ্ঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), বিশ্বব্যাংক এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) যৌথভাবে ‘শূন্য খাদ্য অপচয়ের পথে : বাংলাদেশে টেকসই খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা’ শীর্ষক এক সম্মেলনে গত সোমবার এ তথ্য প্রকাশ করে।

দেশে এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। অন্য দিকে খাদ্যবণ্টন এখনো অসম। তাই খাদ্যের অপচয় কমানো দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এ কথা সত্যি, সীমিত সহায়তার কারণে দেশের কৃষকরা খাদ্য উৎপাদনে হিমশিম খান। তাদের জন্য পর্যাপ্ত সংরক্ষণব্যবস্থা, মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বা অবকাঠামোগত সহায়তা নেই। যখন উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণ করেও যথেষ্ট মূল্য সহায়তা পান না। যা অপচয়ের দিকে নিয়ে যায়। সঙ্গত কারণে খাদ্য অপচয় কমাতে এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তা উন্নত করতে বৃহত্তর সমর্থন ও উন্নত অবকাঠামো গড়ে তোলা আবশ্যক। এদিকে বাংলাদেশ মাটির উর্বরতা, অর্থ, পানি এবং শ্রম হারাচ্ছে। এ কারণে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের জন্য কম খাদ্য উৎপাদিত হচ্ছে। ফলে এই জনগোষ্ঠী খাদ্যঝুঁকিতে পড়ছে।

দেশে শুধু খাদ্য অপচয় হয় না, উৎপাদন ও পরিবহনের সময় কৃষিজমি এবং গ্রিনহাউজ গ্যাসও নষ্ট হয়। অথচ বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম, তাই আমাদের উৎপাদিত খাদ্যে অপচয় রোধ অপরিহার্য। খাদ্য অপচয় বাড়তে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে দুর্লভ পরিবেশগত সম্পদ নিঃশেষের খেসারত আমাদের দিতে হবে।