ফ্যাসিবাদী জমানায় ১৫ বছরে দেশ থেকে পাচার করা হয়েছে কোটি কোটি টাকা। এখন সেই পাচার করা অর্থে গড়ে তোলা সম্পদের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। বিশ্বের পাঁচটি দেশের সাতটি শহরে এ ধরনের অন্তত ৪০ হাজার কোটি টাকার সম্পদের সন্ধান পাওয়ার তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে অর্থ পাচার করে গড়ে তোলা ৩৪৬টি সম্পত্তির সন্ধান মিলেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের (সিআইসি) মহাপরিচালক জানান, এ পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া গেছে, তা প্রকৃত সত্যের সামান্য অংশমাত্র। এখনো প্রচুর তথ্য রয়েছে। তবে যতটুকু তথ্য পাওয়া গেছে তা-ই সিআইসি প্রধান উপদেষ্টার কাছে পেশ করেছে।
স্বৈরাচারের পতনের পর সারা দেশের মানুষ জেনেছে কিভাবে হাসিনা সরকার ও তার অনুগ্রহ পাওয়া দোসররা দেশের সব সম্পদ লুটপাটে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। অর্থনীতির অবস্থা খতিয়ে দেখতে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত কমিটি একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, শেখ হাসিনার সরকার দেশে ‘চোরতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করে। হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে দেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ বছরে গড়ে এক লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার করা হয়, যা বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ৪ শতাংশের সমান। বলা হয়, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। শুধু শেয়ারবাজার থেকে আত্মসাৎ করা হয় এক লাখ কোটি টাকা। আর কেবল ঋণখেলাপি হওয়া অর্থ দিয়ে দেশে ১৩টি মেট্রোরেল অথবা ২২টি পদ্মা সেতু বানানো সম্ভব ছিল।
শেখ হাসিনা এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, চুরির টাকায় পোলাও কোরমা খাওয়ার চেয়ে সৎ উপার্জনে ডালভাত খাওয়া ভালো। সেই ‘সৎ প্রধানমন্ত্রীর’ আমলে কারা এমন ভয়ঙ্কর লুটপাট করল? শ্বেতপত্র কমিটির ভাষ্যমতে, ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদ, তাদের সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী, আর্থিক খাতের রাঘববোয়াল, আমলা ও মধ্যস্বত্বভোগীরা অর্থ লুট ও পাচার করেছেন। শ্বেতপত্রে অর্থনীতি ধ্বংসের যে চিত্র প্রকাশ পেয়েছে; তাতে যেকোনো নাগরিককে আতঙ্কিত করতে যথেষ্ট। আমাদের ধারণা, একটি শ্বেতপত্র যথেষ্ট নয়; বরং রাষ্ট্রের প্রতিটি সেক্টরের ওপর একটি করে শ্বেতপত্র প্রকাশ করা ছিল যথার্থ। সরকার হয়তো বিশেষ কারণে সে দিকে নজর দিতে পারেনি। তবে দৃষ্টি দেয়া দরকার।
রাষ্ট্রদ্রোহী লুটেরাদের চেহারা পুরোপুরি উন্মোচন করা না হলে, বিচার নিশ্চিত না হলে আগামীতে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়া দুষ্কর। এতে নতুন প্রজন্ম দেশের শত্রুমিত্র চিনতে ব্যর্থ হবে। এর আলামত তো অস্পষ্ট নয়। দেখা যাচ্ছে, একটি মহল ফ্যাসিবাদে বিশ্বাসী রাষ্ট্রদ্রোহী সেই দলকে রাজনীতিতে পুনর্বাসনে সচেষ্ট। এ অবস্থা শক্তিশালী বাংলাদেশ বিনির্মাণের অনুক‚ল নয়। সঙ্গত কারণে হাসিনার আমলে অপরাধে জড়িত প্রত্যেক অপরাধীর বিচার যেকোনো মূল্যে নিশ্চিত করতে হবে। এতেই জাতির সামগ্রিক কল্যাণ নিহিত রয়েছে বলে আমাদের বিশ্বাস।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর দেশ বিনির্মাণ করতে হলে অবশ্যই এই লুটেরাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।