পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর প্লাস্টিকের যথেচ্ছ ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে সচেতন মানুষের মনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আছে। নানা সংগঠনের পক্ষ থেকে প্লাস্টিকের ব্যবহার নিষিদ্ধের দাবি তোলা হয়। কিন্তু ব্যক্তি কিংবা সংগঠনের উদ্যোগে এগুলোর ব্যবহার নিষিদ্ধ করার কোনো উপায় না থাকায় কেউ কিছু করতে পারছিল না। সবাই সরকারকেই প্লাস্টিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার জন্য তাগিদ দিয়ে আসছিল। অবশেষে নানামুখী তৎপরতার কারণে সরকার সীমিত পরিসরে হলেও প্লাস্টিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে।

নয়া দিগন্তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোববার থেকে সচিবালয়ে সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টিকারী এসব পণ্য বন্ধে অনুসরণীয় উদাহরণ সৃষ্টি করতে সরকার এ পদক্ষেপ নিয়েছে। এ উদ্যোগের মূল লক্ষ হলো সরকারি দফতরগুলোতে প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ করে পরিবেশবান্ধব ও পুনঃব্যবহারযোগ্য পণ্য ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তোলা।

কিন্তু প্লাস্টিক নিষিদ্ধের এই পরিধি কি সারা দেশের সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়বে? দেশের প্রতিটি প্রান্তরে কি নিষিদ্ধ হবে প্লাস্টিক পণ্যের উৎপাদন ও ব্যবহার? সারা দেশে ক্রমান্বয়ে প্লাস্টিকের উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ না করে শুধু সচিবালয়ে নিষিদ্ধ করলে পরিবেশ রক্ষায় কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাবে না।

বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম দেশ, যারা আইন করে ২০০২ সালে পলিথিন ও প্লাস্টিকের উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। সে সময়ে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় ঐক্যজোট সরকারের এই উদ্যোগ বেশ জনপ্রিয় ও কার্যকর হয়েছিল। ২০০৬ সাল পর্যন্ত পলিথিন-প্লাস্টিকের এই নিষেধাজ্ঞা চলমান থাকলেও তারপর আবারো ব্যাপক শুরু হয় পরিবেশের ও জনস্বাস্থ্যের জন্য এই ক্ষতিকর পণ্যের ব্যবহার।

জাতিসঙ্ঘের পরিবেশবিষয়ক কর্মসূচির (ইউএনইপি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পদ্মা, যমুনা ও মেঘনা নদী দিয়ে প্রতিদিন ৭৩ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য সাগরে মিশছে। অন্য দিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সঙ্ঘ (আইইউসিএন) ও বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত তথ্য মতে, ২০০৫ সালে দেশের শহরাঞ্চলে বছরে মাথাপিছু প্লাস্টিকের ব্যবহার ছিল মাত্র তিন কেজি, যেটি ২০২০ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ৯ কেজিতে উন্নীত হয়েছে। বর্তমানে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই একজন মানুষের বছরে প্লাস্টিকের ব্যবহার ছাড়িয়েছে ২৪ কেজি।

প্লাস্টিক তার জীবনচক্রের বিভিন্ন ধাপে মানুষ ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। গ্রিনহাউজ গ্যাসের একটি কারণ হলো প্লাস্টিক। প্লাস্টিক তৈরিতে প্রায় ৩৮ ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে ১২ থেকে ১৮টি অত্যন্ত ক্ষতিকর। পরিত্যক্ত প্লাস্টিক বাতাস, পানি ও খাবারের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করছে। এ কারণে দীর্ঘমেয়াদে ফুসফুস, কিডনিজনিত রোগ ও ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি করছে। বাংলাদেশে পরিবেশের বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

প্লাস্টিকের উৎপাদন ও ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা না গেলেও একেবারে সীমিত করতে হবে। এ জন্য বিস্তারিত পরিসরে সরকারি ও বেসরকারিভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তবে সবার আগে দরকার প্লাস্টিকের ক্ষতিকর ব্যবহার নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা।