জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনকারী এক অধ্যায়। আধিপত্যবাদের কাছে সমর্পিত দেশকে তরুণ যুবকরা বুকের রক্ত দিয়ে উদ্ধার করেছে। জাতি রক্ষা পেয়েছে ফ্যাসিবাদ আর আধিপত্যবাদের রাহুগ্রাস থেকে। জুলাইয়ে অর্জিত এই নতুন স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে সে সময় সংঘটিত অপরাধের বিচার হতে হবে। তার সাথে দেড় যুগে ফ্যাসিবাদী শক্তি জনগণের বিরুদ্ধে গুম-খুন মানবতাবিরোধী যত অপরাধ করেছে তারও বিচার হতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে মানবতাবিরোধী অপরাধে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়েছে। প্রায় দুই বছর অতিক্রান্ত হলেও বিচারের অগ্রগতি সামান্য। ভুক্তভোগীরা আদৌ বিচার পাবেন কি না তা নিয়ে রীতিমতো হতাশার সৃষ্টি হয়েছে।
জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান দমনে ঢাকাসহ সারা দেশে শেখ হাসিনার নির্দেশে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, ফার্মগেট, মিরপুরসহ আরো কয়েকটি স্পটে রক্তের বন্যা বইয়ে দেয়া হয়। ৫ আগস্ট শুধু যাত্রাবাড়ীতে অর্ধশতাধিক মানুষ নির্মম হত্যার শিকার হন। কিছু জেলা শহরেও একই ধরনের হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। এর পেছনে খুনে বাহিনী ও তাদের ইন্ধনদাতা আওয়ামী লীগ এবং তার পেটোয়া বাহিনীর সদস্যরা প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল। তাদের প্রায় সবাই পরিচিত। এদের অনেকে ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পালিয়ে গেলেও সেখান থেকে কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। এমনকি তারা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধেও অপপ্রচার চালিয়ে বিচার বিতর্কিত করার অপকর্মে লিপ্ত। সময়মতো তদন্ত শেষ করে বিচারপ্রক্রিয়া গুটিয়ে আনা গেলে এরা অপতৎপরতা চালাতে পারত না। ট্রাইব্যুনালে এ পর্যন্ত চারটি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। জুলাইয়ে সংঘটিত বড় বড় হত্যাযজ্ঞ এবং ওয়াসিম, মুগ্ধসহ কয়েক ডজন উল্লেখযোগ্য তরুণের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের বিচারের অগ্রগতি খুব সামান্যই। বিলম্বিত হওয়াই শুধু নয়; বিচার না পাওয়ার শঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। বিচারকাজে গতি আনতে দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। তারপরেও বিচার উল্লেখযোগ্য গতি পায়নি। এর সাথে যুক্ত হয়েছে হাসিনা শাসনে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার বিচারের বিষয়টি। বহু গুপ্ত কারাগার তৈরি করে সেখানে সবধরনের অধিকার হরণ করে আটক ব্যক্তিদের অবর্ণনীয় নির্যাতন করা হয়। এর সাথে রাজনৈতিক নেতা, কিছু সামরিক-বেসামরিক আমলা জড়িত ছিলেন। হাজারো মানুষ এর ভুক্তভোগী হয়েছেন। জুলাইতে সংঘটিত নারকীয় হত্যাযজ্ঞ এবং তার আগের মানবতাবিরোধী অপরাধের কারিগরদের শাস্তি দেয়া না গেলে দেশে কোনোভাবে টেকসই শান্তি ফেরানো যাবে না। বিচার বিলম্বিত কিংবা বিচার ব্যর্থ করে দেয়া গেলে বরং এই আশঙ্কা থেকে যায় যে, ফ্যাসিবাদী শক্তি ও আধিপত্যবাদী গোষ্ঠী কূটকৌশলে দেশে ফিরে আসবে। তারা শুধু জুলাই বিপ্লবের নায়কদের নিশ্চিহ্ন করবে তা নয়, তারা আবারো দেশকে পুরনো অন্ধকার যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। জুলাই বিপ্লবের সফলতা নিঃসন্দেহে তাই এই বিচারের ওপর নির্ভর করছে।
ট্রাইব্যুনালে বিপুল মামলার চাপের বিপরীতে লোকবল সঙ্কট ও প্রয়োজনীয় লজিস্টিকের অভাবের বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। বিচারের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে যাবতীয় সহযোগিতা জরুরি বাড়াতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা কমানো এবং প্রসিকিউশন টিমের পেশাদারিত্বের বিষয়েও সরকারের নজর দেয়া উচিত।