বিগত সাড়ে ১৫ বছর দেশে ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করে অপশাসন চালান শেখ হাসিনা। এ সময় বিরোধী দলের নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ গুম-হত্যা ও ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এত কিছুর পরও শেষরক্ষা হয়নি। চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার তখতে-তাউস উল্টে যায়। অবসান ঘটে আওয়ামী দুঃশাসনের। দেশের মানুষ দেড় দশক পর মুক্তির স্বাদ পান। এ জন্য দেশবাসীকে দিতে হয়েছে বিপুল রক্ত।
শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের বহু নেতাকর্মী; যারা দুষ্কৃতকারী- তাদের গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কিন্তু যে গতিতে তাদের আটক করা হচ্ছে; ঠিক একই গতিতে জামিনে মুক্তি পাচ্ছেন তারা। অথচ যারা গ্রেফতার হয়েছেন; তাদের প্রায় সবার নামে গুরুতর ফৌজদারি মামলা রয়েছে। যেমন- অনেকের বিরুদ্ধে জুলাই অভ্যুত্থানে হত্যা, গুলি ছোড়া, হামলা, পুলিশের সাথে মিলে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার মামলা রয়েছে।
এসব অভিযোগ খুব গুরুতর হলেও কেন আসামিরা জামিন পাচ্ছেন, তা খতিয়ে দেখা উচিত। কারণ, আসামিদের দ্রুত জামিন পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনে পুলিশের দুর্বলতা এবং কিছু আইনজীবীর অপেশাদারত্বভাবে আসামিদের জামিন পেতে সহযোগিতা করার বিষয়টি সামনে এসেছে। অথচ ফ্যাসিবাদের দোসররা এভাবে জামিনে মুক্ত হলে ফের সমাজে অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে। বেড়ে যেতে পারে আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা। শুধু তাই নয়, ফ্যাসিবাদের দোসররা গণহারে জামিন পেলে আগামী সংসদ নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতে পারে। তারা দেশে ঘোরতর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে। এরই মধ্যে দেশের অতি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থাপনায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব নাশকতা কি-না তা নিয়ে জনপরিসরে জোরালো আলোচনা আছে।
আসামিদের জামিন পাওয়া নিয়ে একটি সহযোগী দৈনিককে ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, এখন জামিনের হার শূন্য। তবে যাদের কোনো দলীয় পদ নেই; অসুস্থ, বয়স্ক তারা কিছুটা জামিন পাচ্ছেন। এ শ্রেণীর যারা জামিন পাচ্ছেন তাদের বন্দিত্ব প্রায় এক বছর হয়ে গেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ১০ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ৩০ আগস্ট পর্যন্ত ৪৩ হাজার ৩০২ জন গ্রেফতার হন। তাদের মধ্যে বিগত স্বৈরাচারী সরকারের মন্ত্রী, এমপি, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয়, জেলা, উপজেলা, থানা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ের অপরাধপ্রবণ নেতাকর্মী আছেন। একই সময়ে ৩১ হাজার ২৭২ জন জামিন নিয়েছেন। জামিন দেয়ার কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে অসুস্থতা, বয়স্ক ও দলীয় পদে না থাকা।
জামিন পাওয়া একজন ব্যক্তির আইনি বা মানবাধিকার, এটি স্মরণে রেখেও এ কথা বলা অন্যায্য হবে না যে, জুলাই আন্দোলনে জনবিরোধী কাজের অভিযোগে যেসব আসামি কারাগারে আছেন; তাদের অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্ত করে জামিনসহ অন্যান্য আইনি অধিকার বিবেচনা করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে দেশে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে আসামিদের বিরুদ্ধে প্রামাণ্য তথ্য-উপাত্ত ও প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা পুলিশের একান্ত কর্তব্য, এটি ভুলে গেলে চলবে না।