বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম কাজ জ্ঞান বিতরণ ও গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞান সৃষ্টি করা। বেসরকারি কিছু বিশ্ববিদ্যালয় এক্ষেত্রে সাফল্যের স্বাক্ষর রাখলেও অনেক বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় একেবারেই পিছিয়ে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় মোটেও আগ্রহী নয়।

এক প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে, ৫২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার বিষয়ে অনাগ্রহ রয়েছে। গবেষণার প্রতি অনাগ্রহ উচ্চশিক্ষার ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক। অভাবিতও বটে।

একটি সহযোগী দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় মোটেই আগ্রহ নেই। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- দ্য পিপলস ইউনিভার্সিটি, আশা ইউনিভার্সিটি, সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি, সিটি ইউনিভার্সিটি প্রভৃতি। এমন বিশ্ববিদ্যালয় আছে যারা গবেষণায় এক টাকাও ব্যয় করেনি। আবার কোনোটি এক থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করেছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা খাতে নাম ওঠানোর জন্য নামকাওয়াস্তে কিছু ব্যয় দেখিয়েছে, যা মূলত গবেষণা খাতের ব্যয় নয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব বিষয় উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি ২০২৩ সালের তথ্য নিয়ে তৈরি।

দেশে নব্বইয়ের দশকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ আজকের মতো অবারিত ছিল না। হাতেগোনা কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা সীমিত ছিল। ফলে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য অনেকে ইউরোপ-আমেরিকায় যেতেন। এতে যেমন মেধা পাচার হতো, তেমনি বিপুল অর্থও বিদেশে চলে যেত। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য উচ্চশিক্ষার প্রসারে আইন করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়, যার সংখ্যা এখন শতাধিক।

শুরুর দিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভালো করলেও সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে অনেক মানহীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। কোনোটির মানের ক্ষেত্রে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যায়। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগও রয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান কাক্সিক্ষত দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি গবেষণায় মনোযোগী না হয়ে শুধু বছর শেষে শিক্ষার্থীদের হাতে সনদ তুলে দিতেই বেশি আগ্রহী হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর উদ্দেশ্য অপূর্ণ থেকে যাবে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় নবদিগন্তের সূচনা করেছে তা স্বীকার করতেই হবে। কিন্তু উচ্চশিক্ষার এই ধারা টেকসই করতে গবেষণার বিকল্প নেই। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে গবেষণার পর গবেষণা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মাধ্যমে দেশ উত্তরোত্তর উন্নতির স্বর্ণশিখরে ওঠে। কিন্তু কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি গবেষণাই না থাকে তাহলে জ্ঞান সৃষ্টির দরজা বন্ধ হয়ে যায়। উদ্ভাবনের কথা সেখানে কল্পনাই করা যায় না। আমরা মনে করি, যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার প্রতি অনাগ্রহ রয়েছে তারা পর্যাপ্ত তহবিল গঠনে উদ্যোগী হয়ে গবেষণাকর্মে মনোযোগী হবে। এটি করবে দেশ ও জাতির স্বার্থেই।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম সমস্যা হলো অবকাঠামো। গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চলে শিক্ষার্থীদের অর্থায়নে। তাই গবেষণার অর্থায়ন তাদের জন্য বড় বিষয়। এ জন্য তাদের সরকারি-বেসরকারি ফান্ড গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণার পরিধি বাড়াতে ব্যর্থ হলে মঞ্জুরি কমিশন ব্যবস্থা নিতে পারে। গবেষণা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় জাতির কোনো উপকারে তো আসবেই না; বরং ক্ষতির কারণ হতে পারে।