দেশে শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য প্রকট। এ বৈষম্য যেমন অবকাঠামোগত তেমনি অ্যাকাডেমিক। গ্রাম ও শহরের প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাকা ভবন থাকলেও গত ৩৩ বছরে দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার সবুজ সাথী উচ্চবিদ্যালয়ে কোনো পাকা ভবন নির্মাণ করা হয়নি। টিনশেডের জরাজীর্ণ ভবনেই চলে আসছে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম। এটি দুঃখজনক ও অপ্রত্যাশিত। বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘৩৩ বছরেও বিল্ডিং হলো না। এর বড় কারণ আমরা বিএনপির সঙ্গে যুক্ত। তাই বিদ্যালয়টি বিল্ডিং করেনি বিগত আওয়ামী লীগ সরকার।’ আওয়ামী লীগ সরকার নিছক রাজনৈতিক কারণে যে বৈষম্যের চাষাবাদ শুরু করেছিল, এটি তারই প্রকৃষ্ট নজির।

নয়া দিগন্তে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সবুজ সাথী উচ্চবিদ্যালয়ের বর্তমান ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ৮০৪ জন। পাসের হার ৮৭ শতাংশ। শিক্ষক ও কর্মচারীর সংখ্যা ২৩ জন।

১৯৯২ সালে স্থাপিত বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠালগ্নে নিম্নমাধ্যমিক হিসেবে চালু হলেও ১৯৯৪ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে উন্নীত হয়। প্রতিষ্ঠালগ্নে নিজস্ব ব্যয়ে নির্মিত বিদ্যালয়ের কক্ষগুলো এখন পাঠদানের প্রায় অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীরা ঝুঁঁকি নিয়ে ক্লাস করছে।

বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বলেছে, আমাদেরকে ডিজিটাল যুগে ভাঙাচোরা শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনা করতে হচ্ছে। আমরা এমন পরিবেশ চাই না। বর্তমান প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের কাছে বিনীত আবেদন, তিনি যেন আমাদের স্কুলের বিল্ডিং দ্রুত তৈরি করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

শিক্ষার্থীদের দাবি যৌক্তিক। যেকোনো এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা দেখাশোনা করেন। সবুজ সাথী উচ্চবিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও স্থানীয় সংসদ সদস্য সুপারিশ করেছিলেন; কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। কোনো পাকা ভবন নির্মাণ করা হয়নি।

শিক্ষা শুধু শিক্ষার্থীর চিন্তাকাঠামোর পরিবর্তন করে না; বরং তার ভবিষ্যৎ গতিপথও নির্ধারণ করে দেয়। আর শিক্ষার মূল লক্ষ্য অর্জনের জন্য শিক্ষক, শিক্ষাপদ্ধতির পাশাপাশি প্রয়োজন অবকাঠামোগত পরিবেশের উন্নয়ন। দুর্বল শিক্ষা অবকাঠামো দিয়ে শিক্ষার আসল লক্ষ্য অর্জন ব্যাহত হতে পারে।

গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নানা সমস্যায় জর্জরিত। অনেক প্রতিষ্ঠানের ভবন রয়েছে; কিন্তু নেই মানসম্পন্ন গ্রন্থাগার, ল্যাব কিংবা শিক্ষার অন্যান্য উপকরণ। আবার কিছু প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় ভবনই নেই, কিংবা থাকলেও তা জরাজীর্ণ। এ ছাড়াও যোগ্য শিক্ষকের অভাব তো প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই আছে।

যেসব প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় ভবন নেই, মানসম্পন্ন শিক্ষক নেই, কিংবা ল্যাব ও গ্রন্থাগারের মতো সুযোগ-সুবিধা নেই; সেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মেধার পূর্ণ বিকাশ সম্ভব হয় না। ফলে উপযুক্ত পরিবেশ আর প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা সমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠানের অভাবে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা শিক্ষাক্ষেত্রে বরাবরই পিছিয়ে থাকছে। এতে করে গ্রাম ও শহরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্য বাড়ছে। বৈষম্য বাড়ছে ধনী ও গরিবের মধ্যে।

আমরা বরাবরই লক্ষ করি, সরকার শহরের শিক্ষা নিয়ে যতটা না মনোযোগী, গ্রামের শিক্ষা নিয়ে ঠিক ততটাই উদাসীন। এই প্রবণতা বিপজ্জনক। শিক্ষায় সরকারের বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গির অবসান ঘটাতে হবে।

দেশের যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাকা ভবন নেই, কিংবা জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে; সেগুলোর দ্রুত পাকা ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে।