ইরান যুদ্ধের ধাক্কাটা শিক্ষা খাতেই বড় দাগে পড়তে যাচ্ছে। সরকার জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সশীরের ক্লাসের পাশাপাশি অনলাইনেও ক্লাস করানোর উদ্যোগ নিয়েছে। দেশে অনলাইনে ক্লাস করানোর রেওয়াজ মূলত করোনাকালীন চালু হয়েছিল। সে সময় শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বেই এভাবে ক্লাস হয়েছে। অনলাইন ক্লাস যে সশরীরে ক্লাসের বিকল্প হতে পারে না, সে কথা বরাবরই শিক্ষাবিদরা বলে আসছেন। এ ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ বঞ্চিত হয়। আর তাই শিক্ষাবিদরা সশরীরে ক্লাসের পক্ষেই সবসময় মত দেন।
গত মঙ্গলবার গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি সঙ্কটের পরিপ্রেক্ষিতে মহানগর এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (বিশ্ববিদ্যালয় বাদে) অনলাইন ও সশরীর মিলিয়ে ক্লাস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রাথমিকভাবে সপ্তাহে ছয় দিন ক্লাস রেখে এর মধ্যে জোড়-বিজোড় মিলিয়ে তিন দিন অনলাইন এবং তিন দিন সশরীর পাঠদানের প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। অর্থাৎ— এক দিন অনলাইন ক্লাস হলে তার পরদিন সশরীর ক্লাস করানো হবে। শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন বলেছেন, তারা অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালানোকে উৎসাহিত করার ব্যাপারে আলোচনা করছেন। বিশ্বব্যাপী যে জ্বালানি সঙ্কট চলছে— কেউ জানেন না, কত দিন তা চলবে। সে কারণে তারা ভাবছেন, দেশের স্কুলব্যবস্থাকে অনলাইন ও সশরীর— এই মিশ্র পদ্ধতিতে আনার।
বিদ্যমান প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, অনলাইনে ক্লাস করানো যেতেই পারে; কিন্তু এ জন্য দেশের শিক্ষার্থীরা কতটা উপযুক্ত, সেটিই হচ্ছে মূল বিষয়।
সরকার মহানগরীগুলোতে সপ্তাহে তিন দিন অনলাইনে ক্লাস করানোর যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেটি বাস্তবায়নে প্রথম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অনলাইন ক্লাসের উপকরণ। মহানগরীর স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সবার কি প্রয়োজনীয় ডিভাইস যেমন— মোবাইল ফোন কিংবা কম্পিউটার আছে? অবশ্যই না। এতে করে বিত্তবান পরিবারের সন্তানরা মোবাইল কিংবা কম্পিউটারে অনলাইনে ক্লাস করলেও নিম্ন আয়ের পরিবারের সন্তানরা অনেকেই অনলাইন ক্লাস করা থেকে বঞ্চিত হবে। এ ছাড়াও যারা প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী রয়েছে, তাদের জন্য অনলাইন ক্লাস করা কঠিন হয়ে পড়বে। এর মধ্য দিয়ে সমাজে বৈষম্য আরো তীব্র হবে।
অনলাইনে ক্লাস করার জন্য শিক্ষার্থীদের যে ইন্টারনেট সংযোগ প্রয়োজন, সেটি তাদের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকার চাইলে শিক্ষার্থীদের মোবাইলে ইন্টারনেট ডাটা দিতে পারে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো— অনলাইন ক্লাসে শিখন ঘাটতি। অনলাইনে শিক্ষার্থীরা মনযোগ ধরে রাখতে পারেন না। ইউনিসেফের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, করোনাকালীন ২০ শতাংশেরও কম শিশু অনলাইন ক্লাসে যোগ দিয়েছিল। একে তো অনলাইনের ক্লাসে উপস্থিতি কম, সেই সাথে ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ। সবমিলিয়ে সে সময় শিক্ষার্থীদের যে শিখন ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তা তাদের পরে আর পূরণ করা যায়নি।
সমস্যা শুধু শিক্ষার্থীদের দিক থেকে নয়, শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও রয়েছে। তাদের সবার অনলাইনে ক্লাস নেয়ার মতো সক্ষমতা নেই। অনেকের প্রয়োজনীয় ডিভাইসও নেই।
প্রয়োজনীয় উপকরণ জোগান ও ইন্টারনেট সুবিধা প্রদানের মধ্য দিয়ে অল্প কিছু দিনের জন্য অনলাইন ক্লাস করা যেতে পারে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এ ব্যবস্থা কোনোভাবেই চলতে পারে না। সরকারকে শিক্ষা খাত সবরকম সমস্যামুক্ত রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।