‘অস্থায়ী সুরক্ষা’ বাতিলে ট্রাম্প প্রশাসনকে সুপ্রিম কোর্টের সবুজ সঙ্কেত
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে এক যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ আদালত বা সুপ্রিম কোর্ট। গত বৃস্পতিবার দেয়া ছয়-তিন ভোটের এই রায়ে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনকে হাইতি ও সিরিয়ার সাড়ে তিন লাখেরও বেশি অভিবাসীর ‘অস্থায়ী সুরক্ষা মর্যাদা’ (টেম্পোরারি প্রটেক্টেড স্ট্যাটাস-টিপিএস) প্রত্যাহারের অনুমতি দেয়া হয়েছে।
আদালতের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারক রায়ে উল্লেখ করেন, টিপিএস প্রদান, নবায়ন বা বাতিল করার বিষয়ে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের (ডিএইচএস) সিদ্ধান্ত বিচারিক পর্যালোচনার আওতাভুক্ত নয়। ফলে প্রায় সাড়ে তিন লাখ হাইতিয়ান ও ছয় হাজার সিরীয় নাগরিক এখন দেশটিতে বৈধতা হারিয়ে বহিষ্কারের (ডিপোর্টেশন) চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছেন।
এই রায়কে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির একটি বড় জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সাথে এটি যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা, বিচার বিভাগের ভূমিকা এবং মানবিক অভিবাসন নীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
কী ছিল এই মামলাটি?
‘মুলিন বনাম ডো’ মামলাটি মূলত এই আইনি প্রশ্নকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে, মার্কিন প্রশাসন কোনো দেশের টিপিএস সুবিধা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিলে আদালত তা পুনর্বিবেচনা বা বাতিল করতে পারবে কি না। এর আগে নি¤œ আদালতগুলো ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছিল। তবে সুপ্রিম কোর্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকরা রায় দিয়েছেন যে, কংগ্রেস কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত টিপিএস কর্মসূচি পরিচালনার ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্ত আদালতের মাধ্যমে পরিবর্তনের সুযোগ সীমিত। রায়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত লিখতে গিয়ে বিচারপতি স্যামুয়েল আলিতো বলেন : “হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারির টিপিএস সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত বিচারিক পর্যালোচনার বিষয় নয়।”
এই ব্যাখ্যার মাধ্যমে আদালত অভিবাসন ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ও প্রশাসনের বিস্তৃত ক্ষমতাকে পুনরায় স্বীকৃতি দিলো।
টিপিএস কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
টেম্পোরারি প্রটেক্টেড স্ট্যাটাস বা টিপিএস হচ্ছে ১৯৯০ সালে মার্কিন কংগ্রেস প্রণীত একটি মানবিক কর্মসূচি। এর অধীনে যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা চরম রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের নাগরিকদের সাময়িকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ও কাজ করার আইনি অনুমতি দেয়া হয়। তবে এটি স্থায়ী নাগরিকত্ব বা গ্রিন কার্ড পাওয়ার কোনো পথ নয়।
হাইতি : ২০১০ সালের প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পের পর দেশটিকে প্রথম টিপিএস দেয়া হয়। পরে দেশটির রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, গ্যাং সহিংসতা ও মানবিক সঙ্কটের কারণে এটি বারবার নবায়ন করা হয়েছিল।
সিরিয়া : ২০১২ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দেশটির নাগরিকদের জন্য এই সুবিধা কার্যকর করা হয়।
বর্তমানে প্রায় ১৭টি দেশের ১৩ লাখ মানুষ এই কর্মসূচির আওতায় রয়েছেন। ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় ফেরার পর ইতোমধ্যে ১৩টি দেশের টিপিএস বাতিলের উদ্যোগ নিয়েছে।
ভিন্ন মত পোষণকারী বিচারকদের কঠোর সমালোচনা
সুপ্রিম কোর্টের উদারপন্থী বিচারপতিরা এই সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ের তীব্র সমালোচনা করেছেন। বিচারপতি এলিনা কাগান তার ভিন্ন মতের নোটে বলেন- আদালতের এই সিদ্ধান্ত নির্বাহী বিভাগকে কার্যত “বিচারিক জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে” নিয়ে গেছে, যা প্রশাসনকে বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ করে দিতে পারে।
তিনি আরো অভিযোগ করেন, হাইতিয়ান অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের অতীত রাজনৈতিক বক্তব্য ও প্রচারণার কারণে এই টিপিএস বাতিলের সিদ্ধান্তে বর্ণগত পক্ষপাতের উপাদান থাকতে পারে। বিচারপতি কাগানের মতে, এই রায় ভবিষ্যতে নির্বাহী ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে থাকা গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষাকবচকে দুর্বল করবে।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উদ্বেগ
এই রায়ের ফলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে, যেখানে প্রায় এক লাখ ৫৮ হাজার হাইতিয়ান টিপিএস সুবিধাভোগী বাস করেন। এ ছাড়া নিউ ইয়র্কে প্রায় ৪০ হাজার এবং ওহাইওতে প্রায় ১৪ হাজার হাইতিয়ান নাগরিক রয়েছেন।
রায়ের পর নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি একে অভিবাসী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বড় আঘাত হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এই সিদ্ধান্ত হাজারো মানুষের জীবনে ভয়, অনিশ্চয়তা ও বহিষ্কারের আশঙ্কা সৃষ্টি করবে।
অন্য দিকে অভিবাসন বিষয়ে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত হোয়াইট হাউজের উপ-প্রধান কর্মকর্তা স্টিফেন মিলার এই রায়কে “দশ বছরের সংগ্রামের বিজয়” বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, টিপিএস দীর্ঘদিন ধরে কার্যত একটি অনানুষ্ঠানিক সাধারণ ক্ষমায় পরিণত হয়েছিল এবং এই সিদ্ধান্ত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
রিপাবলিকানদের মধ্যেও বিভক্তি
চমকপ্রদ বিষয় হলো, এই সিদ্ধান্ত নিয়ে খোদ রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেও মতভেদ দেখা দিয়েছে। নিউ ইয়র্কের রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান মাইক ললার (গরশব খধষিবৎ) হাইতিয়ানদের টিপিএস বাতিলের বিরোধিতা করে বলেছেন, হাইতির বর্তমান শোচনীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত অনুচিত। তিনি সতর্ক করে বলেন, বিপুল সংখ্যক হাইতিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা খাতে কর্মরত থাকায় তাদের বহিষ্কার করা হলে হাসপাতাল ও নার্সিং হোমগুলোতে তীব্র কর্মী সঙ্কট সৃষ্টি হতে পারে।
একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ওহাইওর রিপাবলিকান গভর্নর মাইক ডিওয়াইন। তার মতে, হাজার হাজার হাইতিয়ান অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও স্থানীয় সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন, ফলে তাদের তাড়িয়ে দেয়া দেশটির দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের পরিপন্থী।
এখন কী হবে?
সুপ্রিম কোর্টের এই সবুজ সঙ্কেতের পর হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) এখন দ্রুত টিপিএস বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাজের অনুমতি (ওয়ার্ক পারমিট) ও ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ বিভিন্ন আইনি সুবিধা বাতিল হয়ে যাবে। এরপর ভুক্তভোগীদের সামনে মূলত তিনটি পথ খোলা থাকবে :
১. অন্য কোনো আইনি উপায়ে অভিবাসন মর্যাদা অর্জনের চেষ্টা করা।
২. স্বেচ্ছায় যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করা।
৩. অথবা বহিষ্কারের (ডিপোর্টেশন) ঝুঁকি নিয়ে অবৈধভাবে থেকে যাওয়া।
তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে যে, হাইতি ও সিরিয়ার বর্তমান বাস্তবতায় বিপুল সংখ্যক মানুষকে ফেরত পাঠানো গুরুতর মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। জাতিসঙ্ঘের তথ্য অনুযায়ী, হাইতিতে গ্যাং সহিংসতার কারণে ইতোমধ্যে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং সিরিয়াতেও এখনো লাখ লাখ মানুষ যুদ্ধ ও চরম অস্থিতিশীলতার মধ্যে বসবাস করছে।
মূল্যায়ন : বিশ্লেষকদের মতে, এই রায় শুধু হাইতি ও সিরিয়ার অভিবাসীদের ভাগ্যই নির্ধারণ করছে না; বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতির চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, কংগ্রেস, আদালত নাকি হোয়াইট হাউজ, সে প্রশ্নেও একটি নতুন নজির স্থাপন করল। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন এজেন্ডার পরবর্তী ধাপ, বিশেষ করে ‘জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব’ (বার্থরাইট সিটিজেনশিপ) বাতিলের মতো বহুল আলোচিত মামলার ভবিষ্যৎ রায়ের দিকেও এখন পুরো যুক্তরাষ্ট্রের নজর নিবদ্ধ রয়েছে।