খুলনা বিভাগে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার আছে আড়াই হাজার। এগুলোর মধ্যে ২০২৫-২৬ সেশনে লাইসেন্স নবায়ন করেছে মাত্র সাতটি। গতকাল সহযোগী একটি পত্রিকায় এ খবর প্রকাশ করা হয়েছে। খবরে জানানো হয়— পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার শর্ত পূরণ না হওয়ায় বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন আটকে আছে। লাইসেন্সবিহীন বা মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স নিয়ে অবাধে চলছে চিকিৎসাসেবা।
স্বাস্থ্যসেবার নামে খুলনা বিভাগে যে ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে, এটি শুধু একটি অঞ্চলের সমস্যা নয়, দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য খাতের রুগ্ণ দশার প্রতিচ্ছবি। রাজধানী থেকে শুরু করে মফস্বল শহর এমনকি গ্রামগঞ্জ পর্যন্ত যেখানে সেখানে ব্যাঙের ছাতার মতো ক্লিনিক গড়ে উঠেছে। এগুলোর পেছনে থাকে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশ। কিন্তু ক্লিনিকগুলোর গুণগতমান নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায় না। হাসপাতালগুলোতে মৌলিক শর্ত পূরণ না করে অপারেশন ও রোগ নির্ণয়ের মতো সংবেদনশীল কাজ চলছে। এখন বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাত পরিণত হয়েছে নিছক মুনাফাভোগী প্রতিষ্ঠানে। এতে সাধারণ মানুষের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর দায় স্বাস্থ্য বিভাগ কোনোভাবে এড়াতে পারে না।
স্বাস্থ্য অধিদফতর মাঝে মধ্যে লোক দেখানো অভিযান পরিচালনা করে। ক্লিনিকগুলোকে নোটিশ দেয়া হয়। জরিমানা করা হয়; কিন্তু স্থায়ী সমাধান আসে না। এতে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে এসব অনিরাপদ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়ে প্রতারিত হচ্ছেন। তাই বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের লাইসেন্স প্রক্রিয়ায় আরো স্বচ্ছ ও কঠোর হতে হবে সরকারকে। যেসব প্রতিষ্ঠান দক্ষ জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং জরুরি সেবা দেয়ার ন্যূনতম শর্ত পূরণে ব্যর্থ হবে, জননিরাপত্তার স্বার্থে সেগুলো বন্ধ করে দেয়া জরুরি। কারণ একটি অপরিকল্পিত ক্লিনিক মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ছোট ক্লিনিকগুলোর পক্ষে আট থেকে ১০ লাখ টাকা ব্যয় করে ইটিপি বা বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা স্থাপন করা সম্ভব নয় বলে অজুহাত দিচ্ছেন এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকরা। এ অজুহাত মূলত জনস্বাস্থ্যের চেয়ে ব্যবসায়কে বড় করে দেখার নামান্তর। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করে ক্লিনিক পরিচালনা করা মানে হচ্ছে— পরিবেশ ও জনপদকে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলে দেয়া। তাই বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ছোট ক্লিনিকগুলোর জন্য সম্মিলিত বা কেন্দ্রীয় পরিশোধন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় কি না, সেটি নিয়ে নীতিনির্ধারকদের ভাবতে হবে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তদারকি ব্যবস্থা ডিজিটাল করা জরুরি। এ ব্যবস্থায় প্রতিটি বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালের লাইসেন্সের মেয়াদ, সুযোগ-সুবিধা এবং সেবার মান সম্পর্কিত সর্বশেষ তথ্য সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার এ মহোৎসব বন্ধ করতে প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। সেই সাথে সচেতন হতে হবে নাগরিক সমাজকেও। মনে রাখতে হবে, চিকিৎসাসেবা কোনো পণ্য বা বাণিজ্যিক সওদা নয় যে, এর গুণগত মান নিয়ে সামান্যতম আপস করা চলবে। জনস্বার্থ রক্ষা এবং প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিরাপদ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হওয়া উচিত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।