হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের উল্লেখযোগ্য দু’টি নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের একটি ছিল রাজধানীর শাপলা চত্বরের গণহত্যা; অন্যটি মোদিবিরোধী বিক্ষোভে গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যা। শাপলা গণহত্যায় নিহতের সংখ্যা ধামাচাপা দেয়া হয়েছে। মোদিবিরোধী বিক্ষোভে গুলিতে ১৯ জনকে হত্যা করা হয়।

হাসিনা তার সমালোচক ও বিরোধীদের অধিকারের স্বীকৃতি দিতেন না। তাদের প্রতি সবধরনের নিষ্ঠুরতা তিনি চালিয়েছেন। বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে ওই দু’টি বড় হত্যাকাণ্ডের বিষয় সামনে এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকার ওই দুই ঘটনায় ভুক্তভোগীদের প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ ও ক্ষতিপূরণ দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের এমন ইতিবাচক মানবিক কাজকে স্বাগত জানাই।

২০১৩ সালের শাপলা গণহত্যা দেশের ইতিহাসের বর্বরতম ঘটনা। শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের নামে দেশব্যাপী চরম অরাজকতা তৈরি করা হয়। সেখানে বিশেষ করে ইসলাম ধর্ম ও তার প্রতীকগুলোকে প্রকাশ্যে অবমাননা করা হয়। যাকে তাকে এমনকি যেকোনো প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রাজাকার, স্বাধীনতাবিরোধিতার অভিযোগ আনা হচ্ছিল। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় তাদের জীবন ও সম্পদের ওপর নির্বিচারে হামলা চালানো হয়। ওই বছরে ৫ মে অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতের কর্মীরা শাহবাগ উন্মাদনার প্রতিবাদে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমবেত হন। রাতের আঁধারে আলো নিভিয়ে তাদের বিরুদ্ধে সামরিক কায়দায় আক্রমণ করা হয়। রাতের আঁধারে ক্ষতবিক্ষত মানুষের দেহ সরিয়ে নেয়া হয়, পানি দিয়ে রক্তের দাগ ধুয়ে ফেলা হয়। ওই ঘটনায় কতজন মানুষ মারা গেছে তা শেষ পর্যন্ত জানা সম্ভব হয়নি।

এ দিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী দিবসে-২০২১ সালে দাওয়াত দেয়া হয় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে। এমন সময় মোদিকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ জাতীয় অনুষ্ঠানে অতিথি করা হলো যখন ভারতে সংখ্যালঘু মুসলমান নির্যাতন ভয়াবহ আকার নিয়েছে। উগ্র হিন্দুরা গোরক্ষার নামে মুসলমানদের হত্যা করছিল। তাদের বাড়িঘর ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দিচ্ছিল। এর অগে গুজরাটে দাঙ্গা লাগিয়ে কয়েক হাজার মুসলমান হত্যা করেন মোদি। হেফাজতে ইসলামের ডাকে মোদির আগমনের প্রতিবাদে বিক্ষোভে সারা দেশে পুলিশ গুলি চালালে ১৯ জন প্রাণ হারায়। এই সময় পুলিশ ও সরকারি পেটোয়া বাহিনী মসজিদে ঢুকে মুসল্লিদের ওপর নির্যাতন চালায়। বায়তুল মোকাররমসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার বড় বড় মসজিদে ছাত্রলীগ-যুবলীগের সন্ত্রাসীরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অন্তর্বর্তী সরকার শাপলা চত্বরে প্রাণ হারানো ৫৮ জনের পরিবার ও মোদিবিরোধী বিক্ষোভে প্রাণ হারানোদের পরিবারপ্রতি ১০ লাখ টাকা করে দিয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাদের পরিবারের হাতে এই অর্থ তুলে দেয়া হয়।

হাসিনার দুঃশাসনে এ ধরনের বড় বড় হত্যার আরো ঘটনা ঘটেছে। বিগত দেড় দশকে ভুক্তভোগীদের কেউ প্রতিকার পায়নি। প্রাণ হারানো ছাড়াও ওই সব ঘটনায় বহু মানুষ পঙ্গু ও স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এদের প্রত্যেকের প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। যারা এমন অপরাধের পেছনে ছিলেন তাদের উপযুক্ত বিচার হতে হবে। সমাজে স্থায়ী শান্তি ফেরাতে হলে উপযুক্ত প্রতিবিধানের কোনো বিকল্প নেই।