প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় আসার পর মাত্রাতিরিক্ত শুল্ক আরোপের নীতি গ্রহণ করেন। আমাদের পোশাক রফতানির একক বৃহত্তম গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র হওয়ায় ভবিষ্যতে বাজার হারানোর শঙ্কায় বাংলাদেশের ব্যবসায়ী সমাজে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। ৩৫ শতাংশ বাড়তি শুল্ক আরোপ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার সময়মতো উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেনি বলে অভিযোগ করা হয়। ব্যবসায়ী সম্প্রদায় এবং সুশীলসমাজের পক্ষ থেকেও সরকারের অদক্ষতা-গাফিলতির সমালোচনা করা হয়। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য দরকষাকষিতে নিযুক্ত বাংলাদেশ দল সফল হয়েছে। অন্তত পোশাক রফতানিতে প্রতিযোগী দেশগুলোর বেশির ভাগের চেয়ে কম শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য প্রবেশে রফা করতে পেরেছে।
চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রফতানি সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি ঘটেছে বাংলাদেশের। এ সময়ে ২২২ কোটি ডলারের পোশাক রফতানি হয়েছে দেশটিতে। প্রতিযোগী ভিয়েতনাম, চীন ও ভারতের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি এ সময়ে ২৬ শতাংশ বেড়েছে। ভিয়েতনাম ১৩ দশমিক ৮০ শতাংশ, চীন ৪ শতাংশ ও ভারতের ২৪ শতাংশ রফতানি বেড়েছে। এপ্রিলে ট্রাম্প প্রশাসন বিভিন্ন দেশের ওপর প্রতিকারমূলক শুল্ক আরোপ করে। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৯০ দেশের ওপর বিভিন্ন মাত্রায় শুল্ক আরোপ চূড়ান্ত করেছে দেশটি। ১০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৪১ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রতিযোগী দেশগুলো থেকে বেশি শুল্ক ছাড় পেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে শুল্ক ২০ শতাংশ নামিয়ে এনেছে ট্রাম্প প্রশাসন। যা চীনের ওপর ৩০ শতাংশ এবং ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ আরোপ করা হয়েছে।
মার্কিন পণ্য আমদানিতে ভারত উচ্চ শুল্ক আরোপের পাশাপাশি নানাবিধ অশুল্ক বাধাও আরোপ করে রেখেছে। তার ওপর দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বের দাবি উপেক্ষা করে রাশিয়ার সাথে বাণিজ্যসুবিধা বাগিয়ে নিচ্ছে। এর ফলে নানা বিধিনিষেধ থাকার পরও রাশিয়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্বস্তিতে রয়েছে। এ জন্য ভারতের ওপর শুল্ক আরোপের পাশাপাশি কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্রে। যা বাংলাদেশের জন্য কিছু বাড়তি সুবিধা তৈরি করবে। আশা করা যাচ্ছে, মাত্রাতিরিক্ত শুল্ক আরোপ হওয়ায় চীনের থেকেও বাংলাদেশ পোশাক রফতানিতে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। ভিয়েতনামের ওপর ১৯ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। তারা পোশাক রফতানিতে যুক্তরাষ্ট্রে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে দেশটি বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী।
মনে রাখা প্রয়োজন, বাংলাদেশের সবচেয়ে সুবিধাজনক বাজার যুক্তরাষ্ট্র। এ দেশে আমাদের সর্বোচ্চ বাণিজ্য উদ্বৃত্ত। আমরা যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় আট বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রফতানি করি। বিপরীতে মাত্র দুই বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমাদের দেশে রফতানি করে তারা। এদিকে ভারত ও চীন আমাদের বাণিজ্যের সবচেয়ে সুবিধাভোগী। এমনকি পোশাক রফতানির যে কাঁচামাল সেগুলোও আমরা দেশ দুটো থেকে কিনে থাকি। অর্থাৎ- এ বাণিজ্যের একটি পরোক্ষ ভাগীদার ভারত ও চীন। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রের আমাদের কাছে কিছু বাণিজ্যসুবিধা চাওয়া যৌক্তিক। অন্তত তারা আমাদের কাছে দেশটির পণ্য কেনার শর্ত আরোপ করতে পারে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ উড়োজাহাজ ও কৃষিপণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আমাদের পোশাক রফতানি সঙ্কুচিত কিংবা বন্ধ হলে দেশের পুরো অর্থনীতি বিপদে পড়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে লেনদেনে বিষয়টি আমাদের মাথায় থাকতে হবে।