স্বাধীনতার পর কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া অবাধ, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনকে নিজেদের ক্ষমতা অর্জন ও তা স্থায়ী করার হাতিয়ার হিসেবে দেখেছে। স্বাধীনতার পরপর নির্বাচনে বড় ব্যত্যয় ঘটানো হয়। ভোটকেন্দ্র দখল, জালভোট দেয়া ও বিচিত্র সব জালিয়াতির পাশাপাশি এ-সংক্রান্ত আইন নিয়েও ছিনিমিনি খেলা হয়েছে। সব মিলিয়ে নির্বাচনকে বাংলাদেশে এক তামাশা বানিয়ে ফেলা হয়েছে। ক্ষমতাসীনরা নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী নির্বাচনী আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করেছে। সে কারণে দেশের নির্বাচনব্যবস্থা শক্ত ভিতে দাঁড়ায়নি। অন্তর্বর্তী সরকার আরপিওতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে; যাতে অসৎ রাজনীতিকদের জন্য ফাঁকফোকর বন্ধ করা যায়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগের মধ্যে আরপিও সংশোধন অগ্রাধিকার পেয়েছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। এ-সংক্রান্ত বেশ কিছু বিধান যুক্ত করে সংশোধিত আরপিও অধ্যাদেশের খসড়া গত বৃহস্পহিতবার উপদেষ্টা পরিষদ অনুমোদন করেছে। বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় নির্বাচনের অশুভ সংস্কৃতি বন্ধে ‘না’ ভোটের বাধ্যকতা রাখা হচ্ছে। কোনো নির্বাচনী আসনে একজন মাত্র প্রার্থী থাকলে ভোটাররা ‘না’ ভোট দিতে পারবেন। ‘না’ জয়যুক্ত হলে আবার ভোট হতে হবে সেই আসনে। এতে বিনা ভোটে জিতে আসার সুযোগ বন্ধ হবে। শেখ হাসিনা এ ফাঁকফোকর দিয়ে দলীয় লোকদের একচেটিয়া জয়ী করেছেন। প্রার্থীর যোগ্যতা ও সততা গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে দলীয় প্রতীকে ভোট করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। প্রার্থী যে জোট থেকে নির্বাচনে অংশ নিন না কেন, তাকে নিজ দলের প্রতীকে ভোট করতে হবে। অতীতে মার্কা দেখে ভোট দেয়ার যে হুজুগ ছিল, তা এবার বন্ধ হবে, আশা করা যায়।

পোস্টাল ভোটের সুযোগ করে দেয়া হবে আদেশ অনুযায়ী। ফলে নির্বাচনী কাজে যুক্ত কর্মকর্তা, সরকারি কর্মকর্তা ও প্রবাসীরা ভোট দিতে পারবেন। প্রার্থীদের ব্যয়ে স্বচ্ছতা আনতে দান-অনুদান গ্রহণ নিয়ে নিয়ম যুক্ত করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলকে চাঁদা দিলে তা যদি ৫০ হাজার টাকার বেশি হয়; তাহলে ব্যাংকিং চ্যানেলে দিতে হবে। প্রার্থীদের দেশে-বিদেশে থাকা সম্পদ বিবরণী দেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন ওই বিবরণী ওয়েবসাইটে প্রকাশ করবে, যাতে জনগণ তা জানতে পারেন। নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা এখতিয়ার বাড়ানো হয়েছে। কমিশন চাইলে পুরো আসনের ভোট বাতিল করতে পারবে। আগে গণ্ডগোল হলে শুধু কেন্দ্রের ভোট বাতিল করতে পারত ইসি। ভোট গণনার সময় উপস্থিত থাকবেন সাংবাদিকরাও। পলাতক আসামিরা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। এতে ফ্যাসিবাদের দোসর বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ ঠেকানো যাবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের এসব প্রস্তাবে প্রধান দলগুলোর মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তারা হয়তো উপস্থিত লাভালাভের বিবেচনায় আরপিও সংশোধনী দেখছেন। দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনে তারা যে পিষ্ট হয়েছেন, তার অন্যতম কারণ ছিল নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙে পড়া। তাই বড় দলগুলোর দীর্ঘমেয়াদে ভাবা উচিত। নগদ প্রাপ্তির চেয়ে একটি টেকসই নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় রাজি হতে হবে দলগুলোর। বৃহত্তর স্বার্থে দলগুলোর নির্বাচনী ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে একমত হলে ভালো হবে।