কক্সবাজারের সেন্টমার্টিন দ্বীপ নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনার শেষ নেই। এই দ্বীপ নিয়ে গুজবেরও কোনো অন্ত ছিল না। বিশেষত, পতিত শেখ হাসিনা সেন্টমার্টিন নিয়ে মনগড়া বক্তব্য দিয়ে রাজনীতির মাঠে রীতিমতো ফায়দা লুটেছেন। শেখ হাসিনা যখন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তার কাছ থেকে সেন্টমার্টিন চায়- তখন তা নিয়ে আলোচনার ঝড় ওঠে। এখন যখন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সেন্টমার্টিন দ্বীপ রক্ষায় সেখানে পর্যটকদের যাতায়াত কখনো বন্ধ কিংবা নিয়ন্ত্রণ করছে, তখন হাসিনার সেই গোষ্ঠীটি দ্বীপ নিয়ে গুজবের ডালপালা আরো বিস্তৃত করতে থাকে। আদতে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অন্য কারো সেন্টমার্টিন দখলের কোনো ঘটনাই সঠিক ছিল না এবং এখনো নেই। বর্তমান সরকার সেন্টমার্টিন দ্বীপকে পরিবেশগত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে চায়। দ্বীপের বাসিন্দাদের নিরাপদ বসবাস নিশ্চিত করতে চায়। আর সে কারণে সরকার সেন্টমার্টিন নিয়ে মহাপরিকল্পনার খসড়া তৈরি করেছে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত সরকারের খসড়া মহাপরিকল্পনায় দেখা যায়, সেন্টমার্টিন দ্বীপকে চারটি এলাকায় ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হলো- ‘জেনারেল ইউজ জোন’। এ জোনে পর্যটনসহ সাধারণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালানো যাবে। সব হোটেল ও রিসোর্টকে এ জোনের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত রয়েছে ‘ম্যানেজড রিসোর্স জোন’। এটি কচ্ছপের প্রজনন এলাকা। এখানে পর্যটকরা দিনে ঘুরে দেখতে পারবেন, তবে রাতে থাকার অনুমতি থাকবে না। স্থানীয় বাসিন্দারাও এখানকার প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করতে পারবে না।

তৃতীয় জোনটি হলো ‘সাসটেইনেবল ইউজ জোন’। এই জোনে রয়েছে ঝোপঝাড় ও ম্যানগ্রোভ বন। স্থানীয় জনগোষ্ঠী কতটুকু ও কিভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করতে পারবে, তা সরকার নির্ধারণ করবে। পর্যটকরা দিনে প্রবেশ করতে পারবে; কিন্তু রাতযাপনের সুযোগ থাকবে না। চতুর্থ ও সর্বশেষটি সংরক্ষিত এলাকা বা ‘রেস্ট্রিক্টেড জোন’। জীববৈচিত্র্য রক্ষার স্বার্থে এ এলাকায় কোনো ধরনের প্রবেশই অনুমোদিত হবে না।

২০২০-২১ অর্থবছরে সম্পাদিত বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীদের এক গবেষণায় বলা হয়, ‘জীববৈচিত্র্যের আধার’ হিসেবে বিবেচিত দেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপটির প্রবালগুলো রোগাক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। গত চার দশকে এ দ্বীপ উপকূল থেকে হারিয়ে গেছে হাজারো টন প্রবাল ও পাথর। এ কারণে ক্ষয়ের শিকার হয়ে উপকূলের বিস্তীর্ণ ভূমি সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে, বিশেষ করে দ্বীপের উত্তর উপকূলে ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে।

মনুষ্যঘটিত বেশ কয়েকটি প্রভাবে দ্বীপটি যেভাবে পরিবেশগত বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে, তা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে দ্বীপটি সাগরগর্ভে তলিয়ে যেতে পারে।

এমতাবস্থায় সেন্টমার্টিন দ্বীপ, দ্বীপের বাসিন্দা, সমুদ্রের মাছ ও সেখানকার জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকারের এমন মহাপরিকল্পনা বেশ ইতিবাচক। পর্যটনব্যবস্থা সুশৃঙ্খল ও নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে দ্বীপের বাসিন্দাদের জীবিকা নির্বাহে যেন প্রভাব না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

সেন্টমার্টিন দ্বীপ ঘিরে পর্যটকদের মধ্যে এক ধরনের উন্মাদনা আছে- সরকারি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তার রাশ টানা হলো। সেন্টমার্টিন নিয়ে আর রাজনীতি, গুজব কিংবা মিথ্যা তথ্য রটানো নয়। এখন প্রয়োজন এই দ্বীপকে সত্যিকারার্থেই রক্ষা করা আর এ জন্য সরকার যে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তার আশু বাস্তবায়ন।