দেশের অর্থনীতির গতিশীলতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি বেসরকারি বিনিয়োগ। সাম্প্র্রতিক সময়ে এই খাতের স্থবিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে, সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য যা একটি সতর্কবার্তা।
এ বিষয়ে একটি খবর প্রকাশ করেছে নয়া দিগন্ত। এতে সংশ্লিষ্টদের বরাত দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, গত কয়েক বছরে জিডিপির তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগের হার ২৩ থেকে ২৪ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে, যা প্রত্যাশিত ৩০ শতাংশের তুলনায় অনেক কম। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৮ থেকে ৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যেখানে কয়েক বছর আগে এটি ছিল ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ। এসব তথ্য প্রমাণ করে, উদ্যোক্তাদের আস্থায় স্পষ্ট ভাটা পড়েছে।
বিনিয়োগে এই ধীরগতির পেছনে যে কারণগুলো ব্যবসায়ীরা তুলে ধরছেন— ডলার সঙ্কট, উচ্চ সুদের হার, জ্বালানি অনিশ্চয়তা এবং নীতিগত অস্থিরতা। এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; বরং একে-অপরের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ডলার সঙ্কটের কারণে কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্ব হচ্ছে, ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অন্য দিকে ১২ থেকে ১৪ শতাংশ সুদের হার নতুন বিনিয়োগকে প্রায় নিরুৎসাহিত করে তুলছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তা, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে উদ্যোক্তাদের ঝুঁকি নিতে নিরুৎসাহিত করছে।
নীতিগত অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। কর কাঠামোর ঘন ঘন পরিবর্তন এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতির অভাব বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি অনিশ্চিত পরিবেশ তৈরি করছে। একজন বিনিয়োগকারী যখন জানেন না আগামী পাঁচ বছরে নীতির কী পরিবর্তন আসবে, তখন তিনি স্বাভাবিকভাবেই বড় কোনো বিনিয়োগে দ্বিধা করবেন। এই আস্থাহীনতার পরিবেশই এখন বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে এই চিত্র পুরোপুরি হতাশাজনক নয়। অবকাঠামো উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অঞ্চল সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল খাতে অগ্রগতি— এসবই ভবিষ্যতের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে তৈরী পোশাক, আইটি এবং কৃষি-প্রক্রিয়াজাত খাত এখনো বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয়। অর্থাৎ— সমস্যা মূলত সম্ভাবনার অভাবে নয়; বরং সুশাসন ও নীতির দুর্বলতায়।
এই প্রেক্ষাপটে সমাধানের পথ স্পষ্ট হলেও তা বাস্তবায়নে প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গীকার। ব্যাংক ঋণের সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনলে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে উৎসাহিত হন। ডলার বাজারে স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে আমদানিনির্ভর শিল্পগুলো স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হতে পারে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শিল্পোৎপাদনের ভিত্তি হচ্ছে জ্বালানি নিরাপত্তা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নীতিগত স্থিতিশীলতা। অন্তত পাঁচ থেকে ১০ বছরের জন্য একটি সুস্পষ্ট, স্থিতিশীল শিল্প ও করনীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন, যাতে বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারেন। পাশাপাশি কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো এবং সরকারি-বেসরকারি সংলাপ জোরদার করাও অপরিহার্য।
বিনিয়োগের বড় ভিত্তি হলো আস্থা। এই আস্থা তৈরি করতে হলে নীতিনির্ধারকদের শুধু ঘোষণা দিলেই চলবে না— বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই বেসরকারি বিনিয়োগ আবারো গতি পাবে, আর তাতেই সচল হতে পারে অর্থনীতির চাকা।