দুর্নীতি আমাদের সমাজে-রাষ্ট্রে একটি পুরনো সমস্য। বিগত দিনগুলোতে এ সমস্যা সমাধানে নানাবিধ পদক্ষেপ নেয়া হলেও কাজের কাজ হয়নি। এতে দুর্নীতি কমেনি; বরং আগের মতো রয়ে গেছে কিংবা বেড়েছে। গত বুধবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সরকারি সেবা খাতে দুর্নীতির যে চিত্র তুলে ধরেছে, তাতে রাষ্ট্রের পুরনো ক্ষত প্রকাশ পেয়েছে।

বিবিএসের সিটিজেন পারসেপশন সার্ভে ২০২৫-এ বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে সরকারি সেবা নিতে দেশের এক-তৃতীয়াংশ সেবাগ্রহীতা ঘুষ-দুর্নীতির শিকার হন। জরিপ অনুসারে, প্রায় ৩১ দশমিক ৬৭ শতাংশ নাগরিককে গত ১২ মাসে সরকারি পরিষেবা গ্রহণের সময় ঘুষ দিতে হয়েছে। সরকারি সেবা গ্রহণে দুর্নীতির শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। গত এক বছরে সংস্থাটিতে সেবা নিতে আসা নাগরিকদের ৬৩ দশমিক ২৯ শতাংশ ঘুষ-দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। এরপর আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ৫৭ দশমিক ৯৬ এবং পাসপোর্ট অফিসে ৫৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ সেবাগ্রহীতাকে ঘুষ দিতে হয়েছে।

ঘুষ লেনদেনের এই ঘটনা শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়; সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বিবিএসের জরিপ বলছে, ঘুষ দেয়ার ক্ষেত্রে শীর্ষ স্থানে আছে নোয়াখালী আর সর্বনিম্ন স্থানে আছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা।

বিআরটিএ নামক প্রতিষ্ঠানটির দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার শেষ নেই। প্রায়ই সংস্থাটির নামে দুর্নীতির অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশ হতে দেখা যায়। বিবিএসের প্রতিবেদনে দুর্নীতিতে শীর্ষ স্থানে উঠে আসায় তা যেন প্রমাণিত হলো। প্রশ্ন হলো- বিআরটিএর দুর্নীতি বন্ধে কি সরকার বরাবর অপারগ থেকে যাবে? এটিকে সত্যি যদি দুর্নীতিমুক্ত করতে হয়; তাহলে এখানকার দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একইভাবে পাসপোর্ট অফিসের দুর্নীতিও দেশের একটি আলোচিত বিষয়। এ অফিসেও সেবা গ্রহণে নাগরিকদের ভোগান্তির শেষ নেই। অর্থ দিলে সহজে সেবা মেলে, না দিলে ভুগতে হয়। তাই পাসপোর্ট অফিসের দুর্নীতি বন্ধে পদ্ধতিগত দুর্বলতা দূর করতে হবে। অন্য দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ মাঠপর্যায়ে। তাদের শারীরিক ও মানসিক শ্রম বেশি দিতে হয়। সে তুলনায় বেতনভাতা কাক্সিক্ষত মানের নয় বলে অনেকে মনে করেন। এই বাহিনীর সদস্যদের বেতনভাতা বাড়ালে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতে পারে।

তবে স্মরণযোগ্য যে, বাংলাদেশে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে জনবল নিয়োগ ও চাকরিকালীন প্রার্থীর শুধু বাংলা, ইংরেজি, অঙ্ক কিংবা অন্যান্য বিষয়ের জ্ঞান, দক্ষতা ও যোগ্যতা যাছাই করা হয়। কিন্তু নৈতিক চরিত্রের অধিকারী কি না তা দেখার কোনো নিয়ম নেই। সৎ ও নৈতিক চরিত্রবান লোকবল নিয়োগের বিষয়টি উপেক্ষা করায় আজকে রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি জেঁকে বসেছে।

চব্বিশের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের ভেতর দিয়ে একটি দুর্নীতিমুক্ত ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এখনকার জন-অভিপ্রায়। কিন্তু মানুষের সেই চাওয়ার ক্ষেত্রে যে এখনো অগ্রগতি আসেনি বিবিএসের সেবা খাতের দুর্নীতিসংক্রান্ত জরিপ তার ইঙ্গিতবাহী। দুর্নীতি বন্ধে আইন কিংবা দুদকের মতো প্রতিষ্ঠানের যেমন দরকার আছে। তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে জনবল নিয়োগে কাঠামোগত পরিবর্তন আনা। যার মধ্য দিয়ে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। তখন নাগরিকরা সরকারি সেবা পেয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করবেন।