দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির পর তখনকার কর্তৃপক্ষ তা উদ্ধারে যাদের ডেকে আনে, তারা চুরির সাথে জড়িত- এমন সন্দেহ করা হচ্ছিল। ওই অর্থ লোপাটে যারা তদন্ত করেছে ও অর্থ উদ্ধারে এগিয়ে এসেছিল, খোদ চোরদের সাথে তাদের যোগসাজশের আলামত পাওয়া যাচ্ছে। ঘটনার পরম্পরায় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা ভাণ্ডারের চাবি নীলনকশা করে তুলে দেয়া হয়েছিল লুটপাটকারীদের হাতে। গভর্নর থেকে শুরু করে নিচের গুরুত্বপূর্ণ মুখ্য কর্মকর্তারা কেবল তদন্তে উদাসীন ছিলেন এমন নয়, এতে বাধা সৃষ্টিও করেছিলেন। শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থা কতটা নাজুক হয়েছিল, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা চুরির ঘটনা ও তার পরবর্তী তৎপরতা এর নজির হয়ে থাকবে।
২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রিজার্ভ চুরির পর সরকারি কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্য চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে গড়িমসি করে। তদন্তে বিলম্ব, বাধা দান এবং পরে এর সাথে এমন ব্যক্তিদের যুক্ত করা হয়, যারা যাবতীয় রেকর্ড মুছে দিয়ে অর্থ লোপাটকারী চক্রকে আড়াল করার কাজটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করে। এ কারণে লোপাট হওয়া ১০ কোটি ১০ লাখ ডলারের মধ্যে ছয় কোটি ৬০ লাখ ডলার অর্থ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। জানা যায়নি এ গুরুতর চুরির জন্য দায়ী কারা। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক দুই ভারতীয় নাগরিকসহ ২০ জনের ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বিস্তারিত তথ্য চাওয়ার পর বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে ভারতীয় নাগরিক রাকেশ আস্তানা ও নীলা ভান্নানকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভাণ্ডারে প্রবেশের সুযোগ দেয়া হয়। শুধু তাই নয়, আইটি বিভাগে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠারও সুযোগ করে দেয়া হয়। চুরির ঘটনার পর যখন বিদেশী নাগরিকদের কর্মকাণ্ড তদন্তের আওতায় আনা দরকার ছিল, তখন তদন্তে তাদের সহযোগী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রাখা হয়।
এর সাথে ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমান ও হাসিনাপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাচ্ছে। ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা, ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী একযোগে বিদেশীদের সহযোগী ছিলেন। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ আছে। আইটি বিশেষজ্ঞ তানভীর জোহা ওই সময় এ দুষ্টচক্রের বিরুদ্ধে তথ্য দেয়ায় তাকে গুম করা হয়। তদন্ত কাজে সহায়তার কারণে রাষ্ট্রযন্ত্রের পীড়নের শিকার হন তিনি। মোট কথা, হাসিনা সরকার উৎসাহী ছিল না কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লোপাটকারীরা শনাক্ত হোক।
দুঃখজনক হলো, দেশের শাসকরা নিজ দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক লুট করে নিয়েছে। এ কাজে তারা পার্শ্ববর্তী দেশের লোকদেরও সহযোগী করেছে। সে জন্য চুরির ঘটনা ধামচাপা দেয়ার সর্বোচ্চ অপচেষ্টা চালায়। অন্তর্বর্তী সরকারও এখনো পর্যন্ত এ ব্যাপারে তদন্তে অগ্রগতি করতে পারেনি। দুদক সন্দেহভাজন দেশী-বিদেশীদের বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই চুরির ঘটনার আসল চিত্র তলিয়ে দেখতে।
আমরা মনে করি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই কাজে সহযোগী হয়ে এগিয়ে আসবে। সরকারও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দোষীদের শনাক্ত করতে সমন্বয় করে একযোগে কাজ করবে। যেকোনো মূল্যে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।