বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের জন্য অভিবাসী ভিসা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির পররাষ্ট্র দফতর বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সে দেশের সরকারি সুযোগ-সুবিধার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন এমন ব্যক্তিদের প্রবেশ ঠেকাতে এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া পুনর্মূল্যায়ন না হওয়া পর্যন্ত স্থগিতাদেশ বহাল থাকবে। অভিবাসন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনা এবং করদাতাদের অর্থের সুরক্ষা দেয়ার জন্য কঠোর নীতি নিয়েছে দেশটি। তবে এই নীতির বাস্তবায়ন পদ্ধতি ও এর সামগ্রিক প্রভাব গভীরভাবে বিবেচনার দাবি রাখে।
যুক্তরাষ্ট্র একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র। সে হিসেবে অভিবাসন নীতি নির্ধারণের অধিকার একান্তই তাদের। সরকারি কল্যাণ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়লে তা পর্যালোচনা করা স্বাভাবিক। তবে সমস্যাটি তৈরি হয় যখন কোনো পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে অনেক দেশের নাগরিকদের একযোগে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে দেখা হয়।
অভিবাসী ভিসার ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ কোনো তথ্য জানতে পারেনি বলে সহযোগী একটি দৈনিক খবর প্রকাশ করেছে। তবে এই মাসের শুরুতে অভিবাসীদের মধ্যে কোনো দেশের নাগরিকরা যুক্তরাষ্ট্রের বেশি সরকারি সহায়তা নিচ্ছেন, সে তালিকা প্রকাশের পর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপের ইঙ্গিত ছিল। তালিকায় দেখা গেছে ৫৪ দশমিক ৮ শতাংশ বাংলাদেশী অভিবাসী পরিবার কল্যাণ সুবিধা নেয়। এই তথ্যের পেছনে আর্থসামাজিক বাস্তবতা, পেশাগত অবস্থান, অভিবাসনের ধরন এবং প্রজন্মগত পার্থক্যের বিশ্লেষণ ছাড়া সিদ্ধান্ত নেয়া ন্যায়সঙ্গত নয়। এতে যোগ্য, পরিশ্রমী ও আত্মনির্ভরশীল আবেদনকারীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
দীর্ঘ দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও সেবা খাতে বাংলাদেশী অভিবাসীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছেন। শুধু কল্যাণ সুবিধা গ্রহণের হার দিয়ে সেই অবদানকে আড়াল করা যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ঐতিহ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকারের সক্রিয় করণীয় রয়েছে। কূটনৈতিকভাবে বিষয়টি দ্রুত ও সক্রিয়ভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে উত্থাপন করতে হবে। আলোচনায় বাস্তব তথ্য ও বাংলাদেশীদের ইতিবাচক অবদানের পরিসংখ্যান তুলে ধরতে হবে। দেশটিতে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের আইনি সহায়তা, সচেতনতা ও সামাজিক সংযুক্তি বাড়ানোতে সরকার ভূমিকা নিতে পারে। এ ছাড়া অভিবাসনের আগে প্রশিক্ষণ, ভাষা দক্ষতা, কর্মসংস্থানভিত্তিক অভিবাসন এবং আত্মনির্ভরতার ওপর জোর দিতে হবে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এর তদারকি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ব্যাপক স্থগিতাদেশের বদলে লক্ষ্যভিত্তিক যাচাই। খেয়াল রাখতে হবে, অভিবাসীরাই যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ভাবন, শ্রমবাজার ও সামাজিক বৈচিত্র্যের বড় চালিকাশক্তি।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করা ও ভবিষ্যতে যাওয়ার প্রত্যাশায় থাকা বাংলাদেশী অভিবাসীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তাদের যেন সন্দেহের চোখে দেখা না হয়, বৈষম্যের শিকার না হতে হয় এবং তাদের আইনি অধিকার থাকে, এ বিষয়ে দুই দেশেরই দায়িত্ব রয়েছে। মানবিকতা ও ন্যায্যতা না থাকলে এর প্রভাব কেবল অভিবাসীদের ওপর নয়, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপরও পড়ে।
অভিবাসন কেবল সংখ্যার খেলা নয়, এটি মানুষের গল্প। যুক্তরাষ্ট্র যদি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান চায়, তবে স্থগিতাদেশ নয়, তথ্যভিত্তিক ও মানবিক সংস্কার হবে সঠিক পথ। আর বাংলাদেশ সরকারের উচিত আত্মসমালোচনা করা।
কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে নাগরিকদের স্বার্থ রক্ষায় দৃঢ় ভূমিকা রাখা। সংলাপ, সহযোগিতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ায় এই সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।