দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর জাতির ঘারে চেপে বসেছিল শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী সরকার। সেই দানবের কবল থেকে মুক্তি পেতে জাতিকে বিপুল রক্ত দিতে হয়েছে। ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে মুক্তিকামী মানুষের হাতে ধরা দেয় সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ফলে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এ সরকারের কার্যক্রম এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আইনি ভিত্তি দিতে জুলাই সনদ কীভাবে সর্বসম্মতভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন দফায় দফায় আলোচনা করে। সর্বশেষ তিনটি বিকল্প প্রস্তাব নিয়ে আগামী ৫ অক্টোবর ফের বৈঠক হবে।
উল্লেখ্য, বেশির ভাগ দল জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের খসড়ার বিষয়ে একমত হয়ে তাতে স্বাক্ষর করতে সম্মতি জানিয়েছে। তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে কিছু মতপার্থক্য আছে। পরের দু’টি বৈঠকে তা নিরসন করা সম্ভব হতে পারে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রথম বিকল্প হলো- খসড়া সনদের যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে সেগুলো সাংবিধানিক আদেশের মাধ্যমে এখন থেকেই কার্যকর করা। পরবর্তী নির্বাচনের সময় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের মাধ্যমে সনদের প্রস্তাবগুলোর ব্যাপারে জনগণের মতামত নেয়া। দ্বিতীয় বিকল্প- সাংবিধানিক আদেশের মাধ্যমে জুলাই সনদের ঐকমত্যের বিষয়গুলো বাস্তবায়ন শুরু করা। আর সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে, এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের পরামর্শ নেয়া। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের বিষয়ে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ নিয়েছিলেন। এ বিকল্প অনুসারে জুলাই সনদের সম্মত বিষয়গুলোর বাস্তবায়ন এখন থেকে শুরু হতে পারে। আর তৃতীয় বিকল্প হলো- আগামী মধ্য ফেব্রুয়ারিতে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, তা হবে গণপরিষদ নির্বাচন। এ গণপরিষদ নতুন সংবিধান প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নিলে এর খসড়া তৈরি করবে এবং অনুমোদন হওয়ার পর নতুন সংবিধান কার্যকর হবে। গণপরিষদ নতুন সংবিধান প্রণয়ন না করে পুরনো সংবিধানে ব্যাপক সংশোধনী এনে পুনর্বিন্যাস করতে চাইলে তাও করতে পারবে।
নয়া দিগন্তের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের তিনটি বিকল্পের মধ্যে যেটি নিয়ে ঐকমত্য হবে, সে অনুসারে সনদ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে। কমিশন এ বিষয়ে চূড়ান্ত আলোচনায় বসবে ৫ অক্টোবর। ৭ অক্টোবর হতে পারে শেষ বৈঠক। আর ১৪ অক্টোবর জুলাই সনদ স্বাক্ষরের সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ১৫ অক্টোবর জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এ মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না।
প্রসঙ্গত, আনুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচন আয়োজনের দাবিতে জামায়াতে ইসলামীসহ পাঁচটি দল কর্মসূচি পালন করছে। এসব দল সংসদের উভয় কক্ষে আনুপাতিক নির্বাচন চায়। অন্য দিকে, তরুণদের নিয়ে গঠিত নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি উচ্চকক্ষে আনুপাতিক নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে। ঐকমত্য কমিশনের খসড়ায় নিম্নকক্ষে প্রচলিত এবং উচ্চকক্ষে ভোটানুপাতিক নির্বাচনের প্রস্তাব করা হয়েছে। আনুপাতিক নির্বাচনের বিষয়ে শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষ ছাড় দিয়ে নিম্নকক্ষে প্রচলিত এবং উচ্চকক্ষে আনুপাতিক নির্বাচনের বিষয়ে একমত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
ফ্যাসিবাদ-উত্তর দেশকে ধ্বংসস্তূপ থেকে টেনে তুলতে ফ্যাসিবাদবিরোধী সব শক্তির ঐক্য অপরিহার্য। দেশকে গণতান্ত্রিক ধারায় ফেরাতে সব দলকে সঙ্কীর্ণ দলীয় স্বার্থ বাদ দিয়ে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। তা না হলে জাতি আবার সমূহ বিপদে পড়তে পারে।