সুন্দরবন আমাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থকে এক অপার দান। এর বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও এটি রক্ষায় আমাদের নেই সুপরিকল্পিত কর্মসূচি। ফলে দুষ্টচক্র বনের সম্পদ লুণ্ঠনে বাধাহীন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- সুন্দরবনের যেসব জলাশয়ে স্বল্প পানি সেখানে মাছের আবাদ বাড়াতে শুষ্ক মৌসুমে নাশকতামূলক আগুন লাগিয়ে বনের গাছগাছালি উজাড় করা হচ্ছে।
সুন্দরবনে শুষ্ক মৌসুমে আগুন লাগা আসলে দুর্ঘটনা নয়; বরং নাশকতামূলক ঘটনা। বন বিভাগের তথ্যানুযায়ী, ২০০৬-২৫ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনে ৩০টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যাতে প্রায় ৯০ একর বনভ‚মি ধ্বংস হয়েছে। প্রতিটি ঘটনার পর গঠিত হয় তদন্ত কমিটি, উচ্চতর তদন্ত কমিটি। প্রতিটি কমিটিতে সদস্যরা ভিন্ন ভিন্ন থাকলেও তদন্ত প্রতিবেদনে বারবার একই বুলি আওড়ানো হয়। এর পেছনে কাজ করেছে একটি প্রভাবশালী দুষ্টচক্র, যার সাথে ওতপ্রোতোভাবে জড়িত বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা। লক্ষণীয়, আগুন পূর্ব বন বিভাগের আওতাধীন বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলাধীন এলাকাতে লাগে।
আগুন লাগার পেছনে প্রকৃত কারণ কী সে সম্পর্কে নয়া দিগন্তের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। বাস্তবে আগুন ‘লাগে না’, লাগানো হয়! উদ্দেশ্য, অগভীর জলাশয়ের মাছ উৎপাদন বাড়ানো এবং মাছ ধরার সুবিধা তৈরি করা। সুন্দরবনের পূর্বাঞ্চলের চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর, কলমতেজি ও গুলিশাখালিতে বর্ষা মৌসুমে জন্ম নেয় শিং, মাগুর ও কৈ মাছ। এ মাছের চাহিদা ও দাম বেশি। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র মাছের প্রজনন ও আহরণের সুবিধার্থে বর্ষা মৌসুমের আগে মার্চ-এপ্রিলে বনের নির্দিষ্ট জায়গায় আগুন লাগিয়ে জলাশয় প্রস্তুত করে নেয়। বন বিভাগের সূত্র মতে, বনের নির্দিষ্ট এলাকা আগুনে পুড়িয়ে মাছের আবাস উপযোগী করে তোলার এ চক্রে জড়িত স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা।
২০০৭ সালে ড্রেজিং করে বনসংলগ্ন ভোলা নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওই এলাকায় মিষ্টি পানির বিল ও জলাশয় তৈরি হয়। বর্ষায় এসব বিলে মাছ ডিম ছাড়ে এবং তা বড় হয়ে ওঠে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের মধ্যে। তখন শুরু হয় মাছ শিকারের মহোৎসব। এ বছরও ব্যতিক্রম হয়নি। ২২ মার্চ টেপার বিল এলাকায় আগুন লাগে, যা নিয়ন্ত্রণে আনতে সময় লাগে ২৪ ঘণ্টার বেশি। পর দিন ২৩ মার্চ নতুন করে আগুন লাগে শাপলার বিল এলাকায়, যা ছিল আরো ভয়াবহ। বাগেরহাটে অবস্থিত সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, আগুন লাগার তদন্ত প্রতিবেদনে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে একই কথা বলা হয়েছে। তবে আমার মনে হয় আগুন লাগানো হয়।
সুন্দরবনে এ ধরনের অগ্নিকাণ্ডে শুধু গাছপালা নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বনের বাস্তুতন্ত্র, প্রাণিকুল ও জীববৈচিত্র্য। সুন্দরবনের মতো একটি বন বারবার নাশকতার আগুনে পুড়ে যাওয়ার পরও কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়া সত্যিই উদ্বেগজনক। যখন প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষার কথা বলা হচ্ছে সর্বত্র, তখন সুন্দরবন কিছু মানুষের লোভে নাশকতার আগুনে পুড়িয়ে দেয়া আগামী দিনে আমাদের জন্য ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক বিপদ ডেকে আনবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।