গত দেড় দশকে শেখ হাসিনার শাসনে যে ভয়াবহ সব অন্যায় সংঘটিত হয়েছে, তার সঠিক বিচার না হলে দেশ ঘুরে দাঁড়ানো খুব কঠিন। বিচার ও আইনশৃঙ্খলা কাঠামো ধসিয়ে দেয়ায় অবৈধ হাসিনা রেজিমের উপযুক্ত বিচারকার্যক্রম চালানোও চ্যালেঞ্জ হিসেবে হাজির হয়েছে। দুর্নীতিবাজ, মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী ও ফ্যাসিবাদের সহযোগীদের আইনের আওতায় আনার ব্যাপারে স্পষ্ট দুর্বলতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার কাজ ধীরলয়ে চলছে। আদৌ তাদের বিচার হবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কা জাগছে। গ্রেফতার হলেও আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে বেশির ভাগ। এ কারণে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধ হচ্ছে না।
পুলিশের এক প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে, গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে চলতি বছরের ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ফ্যাসিবাদের সাথে জড়িত ৪৪ হাজার ৪৭২ জনকে পুলিশ গ্রেফতার করে। এদের মধ্যে ৩২ হাজার ৩৭১ জন জামিন পেয়েছেন। আটক অভিযুক্তদের ৭৩ শতাংশ জামিন পেয়ে গেছেন। এসব আসামি জুলাই আন্দোলন চলাকালে বিভিন্ন মামলা ও সরকার পতন-পরবর্তী রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে গ্রেফতার হন। তাদের মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগের পদধারী ব্যক্তি এবং ফ্যাসিবাদী সরকারের সহযোগী সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা। গণহারে জামিন পাওয়া গুরুতর অপরাধীদের আদৌ বিচার হবে কি না, সে ব্যাপারে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। আসামিদের উপযুক্ত বিচারে প্রয়োজন সঠিক তথ্য উপাত্ত। তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগও যথাযথ হতে হবে। যিনি যে অপরাধ করেছেন, তার বিরুদ্ধে সে অভিযোগ আনতে হবে।
ফ্যাসিবাদী জমানায় ব্যাংক লুট, সরকারি তহবিল তছরুপসহ দুর্নীতির তুফান চলেছে, মানবাধিকার ভূ-লুণ্ঠিত করা, ভোটাধিকার হরণ, মতপ্রকাশের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। জুলাই আন্দোলনের সময় আন্দোলন দমনে হত্যা, অপহরণসহ নানা নারকীয় নির্যাতন চালানো হয়েছে। আওয়ামী লীগসহ এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পাশাপাশি সরকারের সাথে জড়িত সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনের কিছু লোক এ অপরাধ করেছেন। এখন দেখা যাচ্ছে, এই অপরাধীদের ধরতে এক ধরনের গড়িমসি, আবার ধরা হলেও তাদের বিরুদ্ধে দায়সারা অভিযোগ আনা হচ্ছে। এ কারণে তারা আদালতে সহজে জামিন পেয়ে যাচ্ছেন। ফলে ফ্যাসিবাদের সমর্থকগোষ্ঠীর বাড়তি উৎপাত দেখা যাচ্ছে। তাদের ঝটিকা মিছিল ও নাশকতা বাড়ছে। এবার ককটেল ছুড়ে আসামি ছিনতাই করে নেয়ার অপকৌশল অবলম্বন করেছে তারা।
অপরাধীদের বিরুদ্ধে বিচার ও আইনশৃঙ্খলা কাঠামোর দুর্বলতা স্পষ্ট দৃশ্যমান। শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীরা যে বৃহৎ পরিসরে অপরাধ করেছেন; তার বিচারেও সেই ধরনের বড় প্রচেষ্টা দরকার। আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ে স্বল্পসংখ্যক ব্যক্তি ছাড়া দলের পুরো নেতৃত্ব ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। একই কথা বলা যায়, তার সহযোগী সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তিদের বেলায়। এখনো বড় অপরাধীরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
মনে রাখতে হবে, জনগণের বিরুদ্ধে সংঘটিত প্রতিটি অপরাধের বিচার হতে হবে। তা না হলে ফ্যাসিবাদ পুনরায় ফিরে আসতে পারে। এতে দেশ আবার বিপন্ন হবে। আমরা মনে করি, অন্তর্বর্তী সরকারকে ফ্যাসিবাদীদের বিচারে আরো মনোযোগ দেয়া উচিত। বিচার ও আইনশৃঙ্খলা কাঠামোয় যে দুর্বলতা দৃশ্যমান হচ্ছে; তা কাটিয়ে উঠতে আন্তরিক উদ্যোগ নিতে হবে।