বাংলাদেশ পুলিশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও আইন প্রয়োগকারী একটি বাহিনী। অপরাধ দমনে কাজ করতে গিয়ে এ বাহিনীর কিছু সদস্য নিজেরাই অপরাধে জড়িয়ে পড়েন, যা দুঃখজনক। কিন্তু গত সাড়ে ১৫ বছরে শেখ হাসিনা পুরো বাহিনীকেই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে ফেলেন। এ কাজে নেতৃত্ব দেন পুলিশেরই কিছু কর্মকর্তা যারা ক্ষমতাসীন দলের ধ্বজাধারী হিসেবে অনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন। তারা শেখ হাসিনার অবৈধ ক্ষমতার পাহারাদার হিসেবে সব ধরনের অনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন এবং পুলিশ বাহিনীকে নানা অপরাধমূলক কাজে লিপ্ত করেছেন। পুলিশের অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যেন, তারাই রাষ্ট্রের হর্তাকর্তা। এদের কারণেই বাংলাদেশ হয়ে উঠেছিল একটি পুলিশি রাষ্ট্র।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে পুলিশের আচরণ ছিল অপেশাদারসুলভ সন্ত্রাসী বাহিনীর মতো। পুলিশ যেভাবে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে তা ছিল ন্যক্কারজনক। শুধু গুলি করে হত্যা নয়, লাশের স্তূপ পেট্রল ঢেলে পুড়িয়ে ফেলার মতো পৈশাচিক কাজও করেছে এই বাহিনীর সদস্যরা। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর পুলিশের সব সদস্য দায়িত্ব ফেলে ব্যারাকে ফিরে যায়। হাসিনার আস্থাভাজন যেসব পুলিশ কর্মকর্তা ছাত্র-জনতার খুনের সাথে জড়িত ছিল এবং অতীতে নানা অপকর্ম করেছে তাদের অনেকে চাকরি ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যায়।
গত ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর পুলিশ কাজে ফিরলেও বাহিনীর পলাতক সদস্যরা আর ফেরেনি। তাদের কাজে ফেরার নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিলেও তারা কাজে যোগ দেয়নি। গত বছরের ১ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছিলেন, ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর যেসব পুলিশ সদস্য কাজে যোগ দেয়নি তারা অপরাধী হিসেবে গণ্য হবে।
সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী, কর্মস্থলে বিনা অনুমতিতে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকা গুরুতর অসদাচরণ। কিন্তু পলাতক পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। কারণ পুলিশ সদর দফতর এখন পর্যন্ত পলাতক পুলিশ কর্মকর্তাদের তালিকা দিতে পারেনি। নয়া দিগন্তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পুলিশ সদর দফতরকে পলাতক পুলিশ কর্মকর্তাদের তালিকা চেয়ে একাধিকবার চিঠি দেয়া হয়। কিন্তু তাতে সাড়া মেলেনি। অপরাধী পুলিশের প্রতি পুলিশ সদর দফতরের এই প্রীতি অনভিপ্রেত।
৫ আগস্টের পর সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির যে অভিযোগ-অনুযোগ তার কারণ পুলিশ বাহিনীর ভঙ্গুর অবস্থা। সরকারের উচিত ছিল এই বাহিনীর আমূল সংস্কার করে নতুন করে বাহিনীটিকে ঢেলে সাজানো। কিন্তু সরকার সেটি এখনো করতে পারেনি। পুলিশের পলাতক সদস্যদের তালিকা করে তাদের বিচারের আওতায় আনা দেশের ন্যায়বিচারের স্বার্থেই প্রয়োজন। পলাতক পুলিশ সদস্যরা বিচারহীনভাবে পার পেয়ে গেলে ভবিষ্যতে এ বাহিনীর সদস্যদের অপরাধপ্রবণতা বাড়বে বৈ কমবে না।
আমরা আশা করি, পুলিশ সদর দফতর অবিলম্বে পলাতক পুলিশ সদস্যদের তালিকা প্রণয়ন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেবে। আর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও তালিকা অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।