বিগত স্বৈরাচারী সরকার দেশে অসংখ্য ব্যয়বহুল মেগা প্রকল্প হাতে নেয়। যার বেশির ভাগই লাভজনক হয়নি। এমনই একটি প্রকল্প বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড)। দেশে ব্যাপকভিত্তিক শিল্পায়নের লক্ষ্যে এই প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার ঘোষণা দেয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল- বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রফতানি বহুমুখীকরণ।
নয়া দিগন্তে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ক্ষমতার শেষ ১০ বছরে পতিত সরকার প্রকল্পের সামান্য অংশও বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ১০০টির মধ্যে উৎপাদন শুরু হয়েছে মাত্র ১০-১২টি অঞ্চলে। পূর্ণাঙ্গ ভূমি উন্নয়ন সম্পন্ন হয়েছে ৩৫-৪০টিতে। পানি সরবরাহ, ড্রেনেজ ও সড়কসহ মৌলিক অবকাঠামো কার্যকরভাবে চালু আছে ২০-২৫টির মতো অঞ্চলে। তারপরও রয়ে গেছে মৌলিক অবকাঠামো তৈরির ঘাটতি। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা যায়নি।
এত সব ঘাটতি নিয়ে কোনো একটি অঞ্চলও সুষ্ঠুভাবে উৎপাদনশীল হয়ে ওঠেনি। স্বাভাবিকভাবেই বিদেশী বিনিয়োগ তেমন একটা আসেনি। যেসব বিদেশী উদ্যোক্তা এখানে প্লট পেয়ে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন, তারা এখন আফসোস করছেন। কারণ জ্বালানির অভাবে উৎপাদন শুরু করতে পারছেন না। উৎপাদন শুরু হলেও সড়ক অবকাঠামোর অভাব, কাস্টমস প্রক্রিয়াকরণ ও পরিবেশ ছাড়পত্র পেতে দীর্ঘসূত্রতায় তারা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অনেককে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
মূলত দেশে এ ধরনের কতগুলো অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা বাস্তবসম্মত হবে বা কতগুলোতে লজিস্টিক সরবরাহের সামর্থ্য দেশের আছে, সেসব বিষয় বিবেচনায় না নিয়েই জনতুষ্টিবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে এগিয়েছে সাবেক সরকার। ফলে জনগণের অর্থের যেমন অপচয় হয়েছে, তেমনি বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও বিমুখ হয়ে পড়ছেন। একটি জাপানি শিল্প প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় প্রতিনিধি বলেন, জোনে জমি পেয়েছি; কিন্তু গ্যাস না থাকায় উৎপাদন পরিকল্পনা এক বছর পিছিয়েছে। বিকল্প জ্বালানিতে খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে।
এ ছাড়াও বড় সমস্যা হলো- আমাদের লজিস্টিক ব্যয় আশেপাশের দেশ থেকে অনেক বেশি। বিশ্বব্যাপী গড় হিসাবে একটি দেশের মোট উৎপাদনের (জিডিপি) ৬-৮ শতাংশ লজিস্টিকে ব্যয় হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এই হার ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ। অর্থাৎ- প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পণ্য পরিবহন, সংরক্ষণ ও বন্দর ব্যবস্থাপনায় ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ।
এ ধরনের নানা ভোগান্তির কারণে অনেক বিনিয়োগকারী বাংলাদেশ ছেড়ে ভিয়েতনাম বা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশে চলে যাচ্ছেন।
আমাদের জানা মতে, এমন অনেক এলাকায় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য বৈরী দেশকে জমি দেয়া হয়েছে, যা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। এসব বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে ভেবে দেখতে হবে। তা ছাড়া পুরো এসইজেড প্রকল্পের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার অবকাশ আছে। যে কয়টি অঞ্চলে লজিস্টিক সাপোর্ট দেয়া সম্ভব, সমীক্ষা করে সেগুলো চিহ্নিত করা যেতে পারে। সেগুলো পূর্ণরূপে উৎপাদনশীলতায় নেয়ার দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।
জনগণ শুধু বড় বড় প্রকল্পের ঘোষণা শুনে অথবা চোখ ধাঁধানো অবকাঠামো দেখে এখন আর তুষ্ট হয় না। তারা দেখতে চায়, প্রকৃতই প্রকল্পগুলো প্রত্যাশিত বিনিয়োগ আনতে পারছে কি না। জনস্বার্থে বা জাতীয় স্বার্থে কার্যকর ভূমিকা রাখছে কি না। দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারছে কি না।
এসইজেড প্রকল্পে উৎপাদিত পণ্য জাহাজীকরণে যে বিলম্ব ঘটে তা যেকোনো মূল্যে দূর করতে হবে। অবকাঠামো, বন্দর, কাস্টমস ও ইউটিলিটি সংস্কারে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
মোট কথা, এ প্রকল্পে সৃষ্ট অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে এটিকে সচল করতে হবে।