দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহারে নিহিত রয়েছে জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতি। এ জন্য সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশে যে প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে তা কি আমরা ঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারছি? এমন প্রশ্ন উত্থাপনের কারণ, দেশের একমাত্র পাথরখনির উত্তোলিত পাথর নীতিগত দুর্বলতায় স্তূপাকারে পড়ে আছে। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত মধ্যপাড়া খনি ছিল কৌশলগত সম্পদ। বর্তমানে বিশ্বমানের পাথর উৎপাদন করেও নীতিগত অচলাবস্থা, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও পরিবহন সমস্যায় এটি সঙ্কটে পড়েছে। বাংলাদেশের চলমান বৃহৎ প্রকল্পের যুগে দেশীয় সম্পদ অবহেলা করা মানে বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় ও জাতীয় সম্পদের অপব্যবহার।
নয়া দিগন্তের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিনাজপুরের পার্বতীপুরে অবস্থিত দেশের একমাত্র হার্ডরক খনিজ মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (এমজিএমসিএল) বর্তমানে বিপর্যয়ে পড়েছে। খনির স্ট্যাক ইয়ার্ডে ১১ লাখ ৬০ হাজার টন পাথর মজুদ হয়ে আছে। অথচ প্রতিদিন গড়ে সাড়ে পাঁচ হাজার টন উৎপাদন অব্যাহত থাকায় রাখার জায়গা ফুরিয়ে আসছে। এভাবে চলতে থাকলে খনিতে উৎপাদন বন্ধ করে দেয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এমজিএমসিএলের উৎপাদিত গ্রানাইট বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েট, এলজিইডি ও সড়ক গবেষণাগার কর্তৃক মানসম্মত প্রমাণিত। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে আমদানি করা পাথরের তুলনায় উন্নতমানের ও সাশ্রয়ী। কিন্তু সরকারি প্রকল্প ও ঠিকাদাররা এখনো বিদেশী পাথরের প্রতি নির্ভরশীল থাকায় দেশীয় পাথর বাজারে স্থান পাচ্ছে না। যেখানে দেশে বিশ্বমানের সম্পদ রয়েছে, সেখানে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে কেন আমদানি করা হচ্ছে, তা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। এটি কার স্বার্থে করা হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
বাস্তবে খনির সমস্যার মূল কারণ উৎপাদন সীমাবদ্ধতা নয়; বরং নীতিগত স্থবিরতা। সরকার এখনো পাথর আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়ায় দেশীয় পাথর প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। অন্য দিকে বিস্ফোরক ও অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট আমদানিতে করের চাপ বেড়েছে। এর সাথে ডলারের ঊর্ধ্বগতি যুক্ত হয়ে উৎপাদন খরচ দ্বিগুণ হয়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, এপ্রিলে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় শুল্ক মওকুফের নির্দেশনা দেয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। অন্য দিকে চাহিদা থাকলেও পরিবহন ব্যয় একটি বড় বাধা। বর্তমানে ট্রাকে করে পাথর পাঠাতে হয়, যা ব্যয়বহুল ও সীমিত সক্ষমতার। খনি উন্নয়নকালে মধ্যপাড়া থেকে ভবানীপুর পর্যন্ত একটি বিশেষ রেললাইন নির্মাণ করা হলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তা অচল হয়ে পড়ে।
সরকার দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে মধ্যপাড়া পাথরখনি জাতীয় সম্পদ থেকে আর্থিক বোঝায় পরিণত হবে। বিশ্বমানের সম্পদ থাকার পরও প্রতি বছর বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে পাথর আমদানির কোনো অর্থ নেই। এ ক্ষেত্রে সরকারি প্রকল্পে দেশীয় পাথর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতো আমরাও মনে করি, মধ্যপাড়া পাথরখনির বর্তমান সঙ্কট সমাধানে অবিলম্বে রেললাইন সংস্কার করে সাশ্রয়ী পরিবহন নিশ্চিত করতে হবে। মজুদ পাথর সরাতে জরুরি নীতিগত নির্দেশনা দিতে হবে। আমদানি করা পাথরের শুল্ক বাড়িয়ে প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরির পদক্ষেপও নিতে হবে। বিক্রীত পাথরের ওপর রয়্যালটি নির্ধারণ করতে হবে। সেই সাথে খনির আধুনিকীকরণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের উদ্যোগ নিতে হবে।