রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় সুদি কারবার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে শোধ করতে না পারায় বেকায়দায় পড়ছেন অনেক ঋণগ্রহীতা। অনেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, কেউ বা আত্মহননের পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। অবস্থা এতটাই ভয়াবহ যে, সম্প্রতি রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোর জেলায় ১১ জন মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। গত কয়েক দিনে শুধু রাজশাহীর দু’টি উপজেলাতেই ছয়জন আত্মহত্যা করেছেন।

বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় মানুষের দুর্দিনে আর্থিক ধার-দেনা করার রেওয়াজ বহুল প্রচলিত। আত্মীয়-স্বজন কিংবা পাড়া-প্রতিবেশী পরস্পরের সঙ্কটে পাশে এগিয়ে আসেন। কিন্তু সামাজিক সহমর্মিতার সেই ধারা ক্রমশ বিলীন হয়ে গেছে। এখন আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীর কাছে আর্থিক সাহায্য কমই পাওয়া যায়। এ কারণে বেড়েছে ঘৃণ্য সুদি কারবার। সমাজের অনেকেই সুদি কারবারে জড়িয়ে পড়েছেন। তারা নিম্ন আয়ের অসচ্ছল মানুষকে সুদে অর্থ দিচ্ছেন। অন্যদিকে, মানুষের আর্থিক সঙ্কটের সুযোগ নেয় এনজিওগুলো। তারাও উচ্চ সুদে ঋণ দেয়। সুদি মহাজনরা সুদ দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তির কোনো যোগ্যতার ধার ধারেন না, কোনোরকম অর্থ দিয়ে মাস শেষে সুদ নেয়ার ধান্দায় থাকেন।

এনজিওগুলোও প্রায় একই কায়দায় ঋণ দেয়। ফলে ঋণগ্রহীতা যখন ঋণের টাকা লাভজনকভাবে ব্যবহার করতে পারে না তখন অর্থ পরিশোধে বিপদে পড়েন। অর্থ লগ্নিকারীদের চাপে ঋণগ্রহীতা অনেক সময় পালিয়ে বেড়ান, কখনো মানসিক চাপ সইতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নিতে বাধ্য হন। রাজশাহী অঞ্চলে এমনটিই ঘটছে।

গতকাল বুধবার একটি সহযোগী দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোরের নিম্ন আয়ের মানুষ বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) এবং সুদি কারবারিদের কাছ থেকে উচ্চসুদে ঋণ নিয়ে বেকায়দায় পড়েছেন। ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন অনেকে।

রাজশাহী অঞ্চলের দরিদ্র মানুষকে এ অবস্থা থেকে বাঁচাতে হবে। দেশের এনজিওগুলো অনেক ভালো কার্যক্রম পরিচালনা করে। তাদের অনেক কাজই সমাজ উন্নয়নে সহায়ক। কিন্তু ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম নিয়ে আরো বেশি সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে। ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার যেমন সর্বনিম্ন হওয়া দরকার, তেমনি ঋণগ্রহীতা ঋণের অর্থ যাতে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারেন সে বিষয়েও দিকনির্দেশনা ও নজরদারি থাকা প্রয়োজন। গ্রামে-গঞ্জে এমন অনেক মানুষকে পাওয়া যায় যারা এক এনজিওর কাছ থেকে ঋণ নিয়ে অপর এনজিওর ঋণ পরিশোধ করেন। এমন ব্যক্তিদের ঋণ দেয়ার বিষয়ে বেশি সজাগ থাকতে হবে। সেই সাথে ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অন্যায্য চাপ সৃষ্টিও কাম্য নয়। সমাজে দরিদ্রতা নানা সমস্যার জন্ম দেয়। এনজিওগুলোর প্রকৃত অর্থেই সমাজ থেকে দারিদ্র্যবিমোচনে কাজ করতে হবে। দারিদ্র্য লাঘবে সরকারের দায়িত্বও অনেক। এ ক্ষেত্রে সামাজিক সুরক্ষামূলক কর্মসূচি বাড়ানোর বিকল্প নেই।

সুদ সামাজিক সৌহার্দ্যমূলক সম্পর্ক বিনষ্ট করে। সুদকে সমাজ থেকে বিতাড়িত করাই শ্রেয়। এর পরিবর্তে সমাজে কর্জে হাসানার প্রসার ঘটাতে হবে। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। সেই মানুষ সুদের জালে আটকে গিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেবে- এটি মানবতার অপমান। রাজশাহী অঞ্চলের ঋণগ্রস্ত মানুষকে ঋণ থেকে বাঁচাতে এনজিও ও সুদি মহাজনদের যেমন আরো মানবিক হতে হবে, তেমনি সরকারেরও সক্রিয় ভূমিকা কাম্য।