চব্বিশের জুলাইয়ের আগে আত্মতুষ্টির ঢেকুর তুলতে জিডিপির জাতকুলমান বাদ দিয়ে বছর বছর তাকে মোটাতাজা (প্রবৃদ্ধি) দেখানোর গোমর ফাঁস হচ্ছে। আগে সমালোচক-পর্যালোচনাকারীদের মুখে ছাই দিয়ে বলা হতো (এমনকি করোনাকালেও) জিডিপির চমকপ্রদ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এ নিয়ে ট্রেজারি ও চিন্তা-চৌবাচ্চার (থিংক ট্যাংক) মধ্যে দড়ি টানাটানি চলত। অবস্থাদৃষ্টে মনে হতো, এতে স্বয়ং জিডিপিরই বিব্রত হওয়ার কথা। এটি ঠিক, বাংলাদেশের পরিসংখ্যান দফতর গত অর্ধযুগ ধরে মোটাদাগের পাঁচ পাঁচটি প্রকল্প বাস্তবায়নেই সচেষ্ট ছিল কীভাবে জিডিপির প্রবৃদ্ধিকে উদ্বুদ্ধ করা যায়। ২০১৯-২০-এর এডিপিতেই ছিল এসব প্রকল্প-
১. ডাটা কনভার্সন, মেটা ডাটা প্রিপারেশন অ্যান্ড টাইম সিরিজ ডাটা কম্পাইলেশন; ২. সার্ভেইস অ্যান্ড স্টাডিস রিলেটিং টু জিডিপি রিবেসিং ২০১৫-১৬; ৩. ইমপ্রুভিং অব জিডিপি কম্পাইলেশন অ্যান্ড রিবেসিং অব ইনডিসেস প্রজেক্ট; ৪. ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ফর দ্য ডেভেলপমেন্ট অব স্ট্যাটিস্টিকস ইমপ্লিমেন্টেশন সাপোর্ট (এনএসডিএস); ৫. মডার্নাইজেশন অব ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টস স্ট্যাস্টিকস প্রজেক্ট। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা প্রথম প্রথম জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রক্ষেপণ নিয়ে দ্বিমত পোষণ করলেও চূড়ান্ত জিডিপি ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টস কর্তৃপক্ষ যা দেখায় তাতে আর তাদের না করার থাকে না। কেন না সংস্থাগুলোর আমলা পরামর্শক কাম বিশেষজ্ঞদের দৌড় ও দ্বারস্থ হতে হয় ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টস পর্যন্তই।
একটি দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (বা জিডিপি) হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট সময়ে ওই দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদ, শ্রম, পুঁজি ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে যে পরিমাণ পণ্য ও সেবাজাত দ্রব্য উৎপাদন করা যায় টাকার অঙ্কে হিসাব, আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার হচ্ছে ওই উৎপাদন কী হারে বাড়ছে তার পরিমাণ যেমন : ২০১০-১১ অর্থবছরে (এবং সেই সময়ের বাজার দরে) বাংলাদেশে মোট প্রায় আট লাখ কোটি টাকার পণ্য ও সেবা উৎপাদিত হয় এবং এটি ছিল সে বছরের বাংলাদেশের জিডিপি বা অর্থনীতির আকার। পরের বছর (২০১১-১২) অর্থনীতির আকার বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় সারে আট লাখ কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধির হার ৬.৩ শতাংশ।
প্রবৃদ্ধি সংঘটিত হয় শ্রমশক্তি, প্রাকৃতিক সম্পদ, পুঁজি সঞ্চয় (ভৌত ও মানব), প্রযুক্তির পরিবর্তন ইত্যাদির অবদানের কারণে আর এগুলোকে বলে উৎপাদনের উপকরণ বা ফ্যাক্টরস অব প্রডাকশন। অন্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে, উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি ঘটলে মানুষের কর্মসংস্থান, আয় এবং জীবনকুশলতা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা জাগে এবং এই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আবার মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ঘটায়। সাধারণভাবে ধরে নেয়া হয়, জনসংখ্যা বৃদ্ধি স্থির থাকলে জাতীয় আয় বৃদ্ধিসাপেক্ষে সমাজে সবারই কিছু না কিছু আয় বৃদ্ধি ঘটে যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্যান্য সব সমস্যার সমাধান করে দেয়, যেমন : সুপেয় পানি, স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশন, অসুস্থতা, শিক্ষা ইত্যাদি। কথায় বলে, টাকা থাকলে বাঘের চোখ কেনা যায় কিন্তু টাকা থাকলেই যে উন্নয়ন চোখে দেখা যাবে- এমন কোনো কথা নেই। উন্নয়নের জন্য অবশ্য আয় বৃদ্ধি দরকার হবে যদিও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ঘটলেই জনগণের উন্নয়ন ঘটবে- এটা নিশ্চিত নয়; আর এ জন্যই বলা হয়ে থাকে, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি উন্নয়নের দরকারি শর্ত পূরণ করে, তবে যথেষ্ট শর্ত পূরণ করে না। আয় বৃদ্ধি ঘটলে আমজনতার চাওয়া অমরত্ব না হলেও অন্তত রোগ-শোক, দুর্দিন-দুশ্চিন্তামুক্ত অপেক্ষাকৃত একটি দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা লাভ করা যায়। কিন্তু এখন প্রশ্ন হতে পারে, এই দীর্ঘ জীবন কত দীর্ঘ? অনুমান করা যেতে পারে- গড়পড়তা ৭০-৭৫ বছর বাঁচতে পারাটা স্বস্তিদায়ক, ৭৫-৮০ বছর টিকে গেলে আরো বেশি ভালো এবং ৮০ বছরের উপর বাঁচতে পারলে তো কোনো কথাই নেই। তবে লক্ষ করা গেছে, সময়ের বিবর্তনে মাথাপিছু আয় বাড়ার সাথে সাথে মানুষের আয়ুও বাড়ছে, যেমন : ১৮২০ সালে ভারতে গড় আয়ু ছিল ২১ বছর এবং যুক্তরাজ্যে ৪০ বছর, কিন্তু ১০০ বছরের ব্যবধানে ভারতে গড় আয়ু মাত্র তিন বছর বেড়ে দাঁড়ায় ২৪ বছর, আর একই সময়ে যুক্তরাজ্যে ১০ বছর আয় বেড়ে ৫০ বছরে পৌঁছে; তারও প্রায় ১০০ বছর পর (১৯৯৯) ভারতে প্রত্যাশিত আয়ু ছিল ৬০ বছর ও যুক্তরাজ্যে ৭৭ বছর এবং বাংলাদেশে প্রত্যাশিত গড় আয়ু ১৯৮১ সালে ছিল প্রায় ৫৫ বছর আর ২০১৮ সালে প্রায় ৭০ বছর এবং এভাবেই সমাজে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সাথে বৈষম্য প্রকট হতে পারে।
একটি নির্দিষ্ট উদাহরণ দেয়া যাক, বাংলাদেশে ১৯৭৩-৭৪ সালে গড়পড়তা মাথাপিছু আয় ছিল ১০০-১৫০ ডলার এবং সেই সময় বৈষম্য নির্দেশক গিনিসহগ ছিল বড়জোর ০.৩৫ অথচ এখন (২০২০)। মাথাপিছু আয় দুই হাজার ডলার প্লাস, কিন্তু গিনিসহগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ০.৪৬; সবার আয় বৃদ্ধি পেয়েছে; কিন্তু ধনীর বেড়েছে গরিবের চেয়ে অনেক বেশি হারে, অর্থাৎ সময়ের বিবর্তনে দেশটিতে বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। কথা হচ্ছে, অর্থনৈতিক বৈষম্যেও প্রধান সমস্য হলো বৈষম্যের স্তর বড় থাকলে প্রবৃদ্ধির দারিদ্র্য হ্রাস সংক্রান্ত প্রভাবটি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং একটি অপেক্ষাকৃত সাম্যবাদী সমাজে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যতটুকু দারিদ্র্য হ্রাস করাতে পারে, একটি বৈষম্যমূলক সমাজে তার চেয়ে অনেক কম গতিতে দারিদ্র্য হ্রাস ঘটায়। ল্যাটিন আমেরিকার কোনো কোনো দেশে (যেমন : ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা) প্রবৃদ্ধিও হার অনেক বেশি; কিন্তু তার বিন্যাস এতটাই বেদনাদায়ক ও নির্মম যে, মনে হবে ওই দেশগুলোতে দারিদ্র্য প্রবৃদ্ধিকে উপহাস করছে।
প্রবৃদ্ধি বাড়লে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়ে অন্যান্য ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটতে পারে; কিন্তু প্রবৃদ্ধি ঘটা মানেই উন্নয়ন নয় এবং উন্নয়ন যেখানে আছে সেখানে অবশ্য মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ঘটেছে বলে ধরে নিতে হবে। কিন্তু মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ঘটেছে বলেই সেখানে উন্নয়ন ঘটেছে, এ কথা জোর দিয়ে বলা যাবে না। বস্তুত প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন তখনই একসাথে যেতে পারে যখন অপেক্ষাকৃত সাম্যমূলক নীতি গ্রহণ করা যায়। মোট কথা, এতদিন উন্নয়ন ডিসকোর্সে মানুষের ‘স্বত্বাধিকার’ ও সেই স্বত্বাধিকার থেকে পাওয়া ক্ষমতার দিকে খুব একটা নজর দেয়া হয়নি অথচ ‘অর্থনৈতিক উন্নয়নের চরম লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের সক্ষমতা সৃষ্টি। রোগ প্রতিরোধের অবকাঠামোগত সুবিধা, প্রতিষেধক প্রাপ্তির নিশ্চয়তা, স্বাস্থ্যসেবা, গুণগত শিক্ষালাভের সুযোগ লাভ কী করতে পারছে, কী পারছে না, সেটিই উন্নয়ন তত্ত্বের আলোচ্য হওয়ার কথা। আমজনতা অকালমৃত্যুকে জয় করতে পারছে? তার কি যথেষ্ট পুষ্টির ব্যবস্থা হয়েছে? সে কি পরস্পর চিন্তার আদান-প্রদান করতে পারছে বা শিখেছে? অমর্ত্য সেনের ভাষায় ‘...মানুষের সক্ষমতা প্রসারের প্রক্রিয়াটিই আসলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন।’
আরেকটি টাটকা উদাহরণ আলোচনায় আনা যায়। বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত সমপর্যায়ের অনেক দেশের তুলনায় বেশ কম। বোঝা যায়, তিন কারণে এ দেশের কর-জিডিপি অনুপাত অনেক কম। ১. আওতার সীমাবদ্ধতা, পরিধিগত ঘাটতি। সব যোগ্য করদাতা ও খাতকে করজালের মধ্যে আনতে পারার দীর্ঘসূত্রতা বা ক্ষেত্রবিশেষে অপারগতা, অক্ষমতা। ২. ব্যাপক করছাড়, কররেয়াত, করফাঁকি, মামলায় আটকানো, কর্তন কিংবা আদায়কৃত কর রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা না হওয়া, ৩. রাজস্ব বিভাগের দক্ষ লোকবলের অভাব, অদক্ষতা, অপারগতা, মনিটরিংয়ের দুর্বলতা, কর আইন ও আহরণ ও প্রদান পদ্ধতির জটিলতা, মনোভঙ্গি পরিবর্তনের আবশ্যকতা।
জিডিপি বা অর্থনীতির আকার বড় হচ্ছে, অথচ সক্ষম সব করদাতা এবং প্রযোজ্য সব খাত করজালের আওতায় আসেনি। ফলে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়েনি। যেকোনো দেশে জিডিপির অন্তত ১৫-১৬ শতাংশ কর হিসেবে আহরিত হয়। কিন্তু এ দেশে কর জিডিপির অনুপাত ১০-১১ শতাংশের মধ্যে দীর্ঘ দিন ঘোরাফেরা করছে। এর মানে হয়, জিডিপির বৃদ্ধি কাগজ-কলমে (কাজীর খাতায়) বাস্তবে তার সমিল নেই অথবা এখনো জিডিপির হিস্যা অনুযায়ী অর্জিতব্য কর অনাহরিত থেকে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ৫-৬ শতাংশের একটা ঘাটতি রয়েই যাচ্ছে। বলা বাহুল্য, এ দেশের জিডিপিতে কৃষির অবদান এখনো বেশি। বেশ কয়েক বছর ধরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। এই প্রবৃদ্ধিতে সার্বিকভাবে কৃষির অবদানই বেশি। গত ১০-১২ বছরে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় হোক, বন্যা হোক বা ব্যাপক ফসলহানি হোক, সিডর বা আইলার পরে এবার করোনা আমফান বিদ্যমান বন্যা ছাড়া আর বড় ধরনের অঘটন ঘটেনি। এটি ঠিক, বাংলাদেশের অর্থনীতি হঠাৎ করে বড় হচ্ছে। এটি ধারাবাহিকভাবে গ্রো করেনি। সব খাত ও ক্ষেত্রকে স্বাভাবিক স্পর্শ বা পরিপুষ্ট করে বা করতে এই গ্রোথ দৃশ্যমান হয়নি। সে কারণেই খোদ জিডিপির চেয়ে এর অসার গ্রোথ নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষের পর্যালোচনাই পছন্দ সবার।
লেখক : সাবেক সচিব,
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান