শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি মুখথুবড়ে পড়ে। প্রায় ধ্বংস করা হয় সরকারি-বেসরকারি সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান। হাসিনাসহ তার দোসরদের প্রধান লক্ষ্য ছিল ব্যাংক খাত। বাস্তবতা হলো- এ খাত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়। অবস্থা এমন নাজুক হয় যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনাও ঘটেছে হাসিনার দুঃশাসনে। একের পর এক বেসরকারি ব্যাংকের মালিকানায় হাতবদল ঘটানো হয় রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে। এরপর কিছু অলিগার্ক দিয়ে ঋণের নামে ব্যাংকের তহবিল নিঃশেষ করা হয়। বিশেষ করে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো লুটপাটের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেয়ার সাথে সাথে ধ্বংসপ্রাপ্ত আর্থিক খাত পুনর্গঠনে নানাবিধ পদক্ষেপ ও কর্মসূচি হাতে নেয় ড. ইউনূসের সরকার। এটি দৃশ্যমান হয় অর্থনীতির প্রাণ ব্যাংক খাত ঢেলে সাজানোর চেষ্টার ভেতর দিয়ে। এরই ধারাবাহিকতায় পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে লুটপাটের শিকার পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভ‚ত করার চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

একীভূত নতুন ব্যাংকের নাম হবে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’। নাম চূড়ান্ত করে গঠনপ্রক্রিয়া শুরু করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সরকারের পক্ষে নতুন এই ব্যাংকের মালিক হবে অর্থ বিভাগ।

নয়া দিগন্তের প্রতিবেদন মতে, বিগত কয়েক বছরে ইসলামী ব্যাংক খাতের প্রধান দুর্বৃত্ত এস আলম একাই সাতটি ব্যাংক মালিকানায় নিয়ে সোয়া দুই লাখ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন, যার বেশির ভাগ অংশ বিদেশে পাচার করে নিজে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব স্থগিত করেছেন।

লুটপাটে ব্যাংকগুলো দুর্বল হয়ে পড়লে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়। দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনায় অক্ষম হয়ে পড়ে। ক্ষমতার পালাবদলের পরে এ অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষায় উদ্যোগ নেয়। এর মধ্যে দুর্বল ব্যাংকগুলো একীভ‚ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়। প্রথম ধাপে একীভ‚ত হওয়ার তালিকায় রয়েছে- ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক। এসব ব্যাংকের সম্পদ ও দায়দেনা একত্রিত করে নতুন প্রতিষ্ঠানের অধীনে স্থানান্তর করা হবে।

প্রস্তাবিত নতুন ব্যাংকের মূলধনের বড় অংশ ব্যয় হবে পাঁচটি ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে। দুই লাখ টাকার নিচে থাকা আমানতকারীদের আমানত সুরক্ষা তহবিল থেকে পরিশোধ করা হবে। এর বেশি অঙ্কের আমানত পর্যায়ক্রমে দেয়া হবে। এ পদক্ষেপে সাধারণ মানুষ আবারো ইসলামী ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরে পাবে, এটি সহজে অনুমেয়।

দুর্বল পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে নতুন ব্যাংক গঠন বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তাই সরকারি মালিকানায় নতুন একটি বড় ইসলামী ব্যাংক গঠিত হলে মানুষ এ ধারার আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ফের বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন বলে আশা করা যায়। এ ক্ষেত্রে সুশাসন ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। তবে নীতিনির্ধারকদের এ কথা স্মরণে রাখা আবশ্যক, রাজনৈতিক প্রভাব ও অদক্ষ পরিচালনা অব্যাহত থাকলে পুরনো সঙ্কট নতুন আকারে ফিরে আসার আশঙ্কাও রয়েছে। তবে ব্যাংক একীভ‚তকরণে সবার আগে আমানতকারী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত কর্মীদের স্বার্থ দেখাটা মানবিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত জরুরি বলে আমরা মনে করি।