ভারতের রাজধানী দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে প্রকাশ্যে। গত শনিবার (২০ ডিসেম্বর) রাতে একটি উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের নেতাকর্মী নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে নজিরবিহীনভাবে বাংলাদেশ হাইকমিশন গেটে পৌঁছে যায়। সেখানে তারা কেবল বাংলাদেশবিরোধী স্লোগান দেয়নি, বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে হত্যার হুমকিও দেয়। দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী উগ্রবাদীদের বাধা দেয়নি। অথচ আন্তর্জাতিক আইনে যেকোনো দেশের কূটনীতিক ও কূটনৈতিক স্থাপনার পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দেশ বাধ্য। এ কারণে সম্প্রতি ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাস অভিমুখে একটি দলের মিছিল আগেই থামিয়ে দেয় বাংলাদেশের পুলিশ।

বাংলাদেশের হাইকমিশনের নিরাপত্তা দিতে ভারত আগেও অনীহা দেখিয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর আগরতলায় বাংলাদেশ মিশনে হামলা ও ভাঙচুর করে ভারতীয় উগ্রবাদীরা। তখনো আগরতলার পুলিশ নিষ্ক্রিয় ছিল।

দিল্লির ঘটনাটি এমন সময় ঘটল যখন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে টানাপড়েন চরমে উঠেছে। কিন্তু এর দায় কোনোভাবে বাংলাদেশের নয়। সম্প্রতি ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করে জুলাই বিপ্লবী ওসমান হাদির হত্যাকারীরা ভারতে আশ্রয় নিয়ে থাকলে তাদের গ্রেফতার করে হস্তান্তরের দাবি জানায় বাংলাদেশ। এতে ভারত পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে বাংলাদেশের দূতকে তলব করে। তারা কূটনৈতিক বাধ্যবাধকতার আলোকে বাংলাদেশে অবস্থিত বিভিন্ন ভারতীয় মিশন ও পোস্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানায়।

গণ-অভ্যুত্থানে পতিত শেখ হাসিনাকে ভারত চুক্তি অনুযায়ী ফেরত দেয়নি। বাংলাদেশের উপর্যুপরি অনুরোধ নীরবে উপেক্ষা করেছে দিল্লি। এ দায় ভারতকে নিতে হবে। বাংলাদেশ নিয়ম মেনে ভারতের এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে ভারতের বাংলাদেশনীতি আন্তর্জাতিক রীতিনীতির সাথে সাংঘর্ষিক। এটি কখনো বাংলাদেশের প্রতি বন্ধুসুলভ নয়। আওয়ামী লীগ গায়ের জোরে ভারতকে বন্ধু হিসেবে বাংলাদেশের জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও ভারত একই নীতিতে আছে, যা কোনোভাবে প্রত্যাশিত নয়।

তবে গত বৃহস্পতিবার একটি অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ না করার নীতি গ্রহণ করেছে ভারত। দেশটির পার্লামেন্টে পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ভারত সরকার বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ না করার একটি সুনির্দিষ্ট নীতি গ্রহণ করেছে, একই সাথে অন্তর্বর্তী সরকার এবং অন্যান্য গণতান্ত্রিক অংশীদারের সাথে গঠনমূলক যোগাযোগ বজায় রেখেছে।

কংগ্রেসের সংসদ সদস্য শশী থারুরের নেতৃত্বাধীন কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত বাংলাদেশের সাথে একটি গঠনমূলক, বাস্তবসম্মত, পারস্পরিক-উপকারী এবং দূরদর্শী সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে।

ভারত এতদিন বাংলাদেশে হস্তক্ষেপের নীতি অনুসরণ করেছে বলে বাংলাদেশের মানুষ যে অভিযোগ তুলেছে, ভারতীয় সংসদীয় কমিটির সর্বশেষ অবস্থান সেই অভিযোগের প্রত্যয়ন। সুতরাং ভারত বায়ুদূষণের বশে অস্বাভাবিক পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ না করে ভিয়েনা কনভেনশনের আওতায় আন্তর্জাতিক রীতি মেনে সমমর্যাদার ভিত্তিতে সৎ প্রতিবেশীসুলভ আচরণ করবে- এটিই এ মুহূর্তে একমাত্র কাম্য।

আমরা আশা করব, বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড বন্ধ করে ভারত তার সদিচ্ছার প্রমাণ দেবে এবং বিদ্বেষমুক্ত সাদা দিলে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে। বাংলাদেশ ভারতের জনগণের বিরুদ্ধে নয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আত্মমর্যাদা বিকিয়ে দিয়ে আর কোনো সম্পর্ক হবে না।