বাংলাদেশে ২৪টি স্থলবন্দরের ২৩টিই ভারতের সাথে। কিন্তু ব্যবসায়-বাণিজ্য-যোগাযোগ বিকাশে এগুলো সেভাবে কার্যকর হয়নি। বেশির ভাগ স্থলবন্দর ব্যবস্থাপনায় ভারতের আর্থ-বাণিজ্যিক স্বার্থ প্রাধান্য পেয়েছে। প্রতিবেশী দেশটির সাথে দুই ডজন স্থলবন্দরের আদৌ প্রয়োজন রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হয়নি। অসম সম্পর্কের চাপে কিংবা আবেগের বশবর্তী হয়ে লাভালাভের বিষয়টি যাচাই না করে বন্দর অবকাঠমো নির্মাণ করা হয়েছে। স্বল্প দূরত্বের মধ্যে একই জেলায় ভারত সীমান্তে একাধিক স্থলবন্দর নির্মাণ করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে এমনো ঘটেছে যে, বাংলাদেশ অংশে বন্দর অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু ভারতের অংশে বন্দর অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরুই হয়নি। এ অবস্থায় বাংলাদেশকে ক্রমাগত গচ্চা দিতে হচ্ছে। ব্যবসায়-বাণিজ্যে আবেগের কোনো স্থান না থাকলেও ভারতের সাথে এমনটি করে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্বল্পপরিসরে আটটি বন্দরে বাংলাদেশের লাভ-ক্ষতি খতিয়ে দেখার চেষ্টা হয়েছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এ লক্ষ্যে গত বছরের নভেম্বরে একটি কমিটি গঠন করে। তদন্তে দেখা যায়, নীলফামারীর চিলাহাটি, চুয়াডাঙ্গার দৌলতগঞ্জ, রাঙ্গামাটির তেগামুখ ও হবিগঞ্জের বাল্লা এই চার স্থলবন্দর পরিচালনা বাংলাদেশের জন্য অলাভজনক। তাই এগুলোর কার্যক্রম বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়। বাল্লা স্থলবন্দরের ভারতের অংশে অবকাঠামো ও সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হয়নি। অথচ বাংলাদেশ অংশে সব কাজ শেষ করে বসে আছে।
কমিটি আরো চারটি স্থলবন্দর শর্তসাপেক্ষে চালু রাখার সুপারিশ করেছে।
ময়মনসিংহের গোবরাকুড়া ও কড়াইতলী দু’টি স্থানে বন্দর চালু রয়েছে, দু’টি স্থানের পরিবর্তে একটিতে বন্দরকার্যক্রম চালু রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
শেরপুরের নাকুগাঁও স্থলবন্দর চালু রাখতে হলে একে আরো গতিশীল করার তাগিদ দেয়া হয়েছে। জামালপুরের ধানুয়া কামালপুর স্থলবন্দরে প্রয়োজনীয় আরো কিছু অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। তাই বিনিয়োগ বিবেচনায় ন্যূনতম জনবল দিয়ে বন্দরের কার্যক্রম চালু রাখার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। যাতে এ বন্দরে সরকারকে কোনো গচ্চা দিতে না হয়। অন্যদিকে দিনাজপুরের বিরল স্থলবন্দর অর্থনৈতিকভাবে টেকসই হতে উভয় দেশের মধ্যে রেলপথ চালু থাকার শর্ত আরোপ করা হয়েছে। আমদানি-রফতানি সচল না থাকলে এ বন্দরও সরকারের জন্য একটি অলাভজনক প্রকল্প হবে।
বাংলাদেশের তিন দিক ঘিরে ভারত। সেই বিবেচনায় ব্যবসায়-বাণিজ্য প্রসারে দেশটির সাথে একটি উন্নত সক্ষম স্থলবন্দর কার্যক্রম কাম্য ছিল। বাস্তবে ভারতীয় স্বার্থকে একচেটিয়া প্রাধান্য দিতে গিয়ে প্রতিবেশী দেশটির সাথে আমাদের লেনদেন ভারসাম্যপূর্ণভাবে অগ্রসর হয়নি। বহুসংখ্যক স্থলবন্দর নির্মিত হলেও তা থেকে বাংলাদেশ লাভবান হতে পারেনি। আমাদের স্থলসীমান্তের অন্য দেশটি মিয়ানমার। এ দেশের সাথে আমাদের বাণিজ্যের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। সেই অর্থে দেশটির সাথে আমাদের যোগাযোগ তেমন গড়ে ওঠেনি, এদের সাথে রয়েছে আমাদের একটিমাত্র স্থলবন্দর। মিয়ানমার এখন অভ্যন্তরীণ সমস্যায় জর্জরিত, এর ওপর রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে আমাদের রয়েছে বৈরী সম্পর্ক। তবু ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক স্বার্থে মিয়ানমারের সাথে আমাদের সম্পর্ক জোরদার করতে হবে। ব্যবসায়-বাণিজ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশটির সাথে আরো স্থলবন্দর স্থাপন করতে হবে আমাদের।