মালিকের পুঁজি, শ্রমিকের শ্রমে গড়ে ওঠে শিল্পকারখানা। শিল্পের ভিত মূলত মালিক-শ্রমিক মৈত্রীতে। এ ক্ষেত্রে উভয়ের সম্পর্ক আইন দ্বারা নির্ণীত; সেটি শ্রম আইন। কিন্তু আমাদের দেশে বেশির ভাগ সময় মালিকপক্ষ অতিরিক্ত মুনাফার লোভে আইন ও বিধিবিধান ভঙ্গ করে। ফলে মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক তিক্ততায় গড়ায়। কিছু দিন পরপর শ্রমিকরা দাবিদাওয়া আদায়ে রাস্তায় নামতে বাধ্য হচ্ছে এ দেশে। মালিক- শ্রমিক উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায়ে রাখতে মুখ্য ভূমিকা পালন করার কথা থাকলেও সরকার তাতে ব্যর্থ হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকার শুধু মালিকপক্ষ নয়; শ্রমিকদের ন্যূনতম স্বার্থ রক্ষা করে ১৭ নভেম্বর শ্রম আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫ জারি করে। এতে শ্রমিকের সংজ্ঞা স্পষ্টের পাশাপাশি গৃহশ্রমিকদের সংগঠন করার অধিকার, ২০ শ্রমিকের সম্মতিতে ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন, প্রতিষ্ঠানে ১০০ শ্রমিক থাকলে ভবিষ্যৎ তহবিল বাধ্যতামূলক, মাতৃত্বকালীন ছুটি ১১২ দিন থেকে বাড়িয়ে ১২০ দিন, বার্ষিক উৎসব ছুটি ১১ দিন থেকে বাড়িয়ে ১৩ দিন করাসহ বিভিন্ন পরিবর্তন আনা হয়। সংশোধিত শ্রম আইনে তৈরী পোশাক, ট্যানারি, ওষুধসহ বিভিন্ন খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি কাঠামো পাঁচ বছরের পরিবর্তে তিন বছর অন্তর নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
বিভিন্ন দাবি বাস্তবায়িত হওয়ায় শ্রম আইন সংশোধনকে শ্রমিকনেতারা স্বাগত জানান। তবে প্রজ্ঞাপন জারির পর তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেন তৈরী পোশাক ও বস্ত্রকলের মালিকদের তিন সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএ নেতারা। পরে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন (বিইএফ) ১৭টি অসঙ্গতি চিহ্নিত করে সংশোধনের দাবি জানিয়েছে।
মালিকপক্ষের চাপে দুই মাস যেতে না যেতে শ্রম আইন সংশোধন করতে চায় সরকার। কোন কোন ধারা সংশোধন করতে হবে, তা নিয়ে আলোচনা করতে মালিক-শ্রমিক, সরকার এই ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের (টিসিসি) সভা ডাকা হয়েছিল। যদিও আগের দিন ‘অনিবার্য কারণ’ দেখিয়ে সভাটি স্থগিত করে মন্ত্রণালয়।
শ্রমিকনেতারা বলছেন, এখন পর্যন্ত সংশোধিত শ্রম আইন বাস্তবায়নে কোনো জটিলতা হয়নি। অন্য দিকে মালিকপক্ষের নেতারা বলছেন, শ্রম আইন সংশোধনে টিসিসির সভার সর্বসম্মতিক্রমে হওয়া কয়েকটি সিদ্ধান্ত থেকে সরে গেছে সরকার। সেই সাথে জারি হওয়া অধ্যাদেশে বেশ কিছু অসঙ্গতি রয়েছে। সংশোধিত শ্রম অধ্যাদেশ শিল্প খাতে অসন্তোষ আনতে পারে বলে মালিকপক্ষের আশঙ্কা।
সংশোধিত শ্রম আইন বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সমস্যা হলে সংশোধনের প্রশ্ন আসবে, শ্রমিকনেতাদের এমন জিজ্ঞাসা অযৌক্তিক নয়। এর আগে কেন সরকার সংশোধন নিয়ে আলোচনা শুরু করতে চায়, এটি বোধগম্য নয়।
রাষ্ট্রীয় আইন মেনে মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক নির্মিত হয়। উভয়ের মধ্যেকার সম্পর্ক পেশাগত, যা আইন ও নীতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যেখানে উভয় পক্ষের দায়িত্ব¡ ও কর্তব্য রয়েছে। মালিকের জন্য ন্যায্য মজুরি ও সুবিধার নিশ্চয়তা দেয়া এবং শ্রমিকের দায়িত্ব সততা ও নিষ্ঠার সাথে অর্পিত দায়িত্ব পালন করা, যা সৌহার্দ্যপূর্ণ ও কল্যাণমুখী পরিবেশ নিশ্চিত করে।
মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক একটি ভারসাম্যপূর্ণ, পারস্পরিক সম্মান ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত, যাতে উৎপাদনশীলতা ও সামাজিক শান্তি নিশ্চিত হয়। এ ক্ষেত্রে শ্রম আইন কঠোরভাবে অনুসরণ করা দরকার। তাই সরকার, মালিক ও শ্রমিকপক্ষের খোলামেলা আলোচনায় সংশোধিত শ্রম আইন বাস্তবায়নের পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়ক হবে বলে আমরা মনে করি।