জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭-কে সামনে রেখে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়ন ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ গোলটেবিল আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শনিবার (২০ জুন) সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে এগ্রিকালচারিস্টস্ ফোরাম অব বাংলাদেশের উদ্যোগে এই সভার আয়োজন করা হয়, যেখানে দেশের বিশিষ্ট কৃষিবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও নীতি-নির্ধারকরা অংশ নেন।
আলোচকরা আসন্ন বাজেটে টেকসই কৃষি উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের আধুনিকায়নে বরাদ্দ বৃদ্ধির জোর দাবি জানান।
অর্থবছর পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়ে প্রধান অতিথি প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মোল্লা (এমপি) বর্তমান জুলাই-জুন অর্থবছরের পরিবর্তে জানুয়ারি থেকে অর্থবছর শুরুর প্রস্তাব দেন, যার জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে বলে তিনি জানান।
উন্নয়ন বাজেটের মাত্র ১০-১২ শতাংশ প্রথম ছয়-সাত মাসে ব্যয় হয় এবং বছরের শেষভাগে তড়িঘড়ি ভাউচারের মাধ্যমে ৪০-৫০ শতাংশ ব্যয় করার প্রবণতা কাজের মান নষ্ট করে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি রাজনীতিবিদ ও আমলাদের জনগণের সম্পদের অপচয় এবং দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ পাচার বন্ধের আহ্বান জানান।
তিনি আরো বলেন, রাজনীতিবিদরা দেশে চিকিৎসা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলে দেশের হাসপাতালব্যবস্থার দ্রুত উন্নয়ন সম্ভব। কৃষিতে ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহারজনিত আর্সেনিক সমস্যা সমাধানে তিনি উপরিভাগের পানি ব্যবহার ও শিল্পে বাধ্যতামূলক ইটিপি স্থাপনের ওপর জোর দেন।
একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম জানান, এ বছর সামগ্রিক বাজেট প্রায় ১৯ শতাংশ বাড়লেও কৃষি বাজেট বেড়েছে মাত্র ১.২ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় প্রকৃতপক্ষে হ্রাস। গত দেড় দশকে মোট বাজেট প্রায় পৌনে ছয় গুণ বাড়লেও কৃষি বাজেটের অংশ ক্রমাগত কমেছে—২০১১-১২ সালে যা ছিল ১০.৬৫ শতাংশ, গত বছর তা ৬ শতাংশে এবং এবার নেমেছে ৫ শতাংশে।
কৃষি ঋণের প্রবৃদ্ধি গত ১৫ বছরে বার্ষিক ৮ শতাংশ হারে বেড়ে এখন প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছালেও, এটি মোট ঋণের মাত্র ২ শতাংশ এবং কৃষকদের মাত্র ২২ শতাংশ এর আওতায় আসে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগও অপ্রতুল—চীন-ভিয়েতনামের মতো দেশ কৃষি জিডিপির ৩-৫ শতাংশ গবেষণায় ব্যয় করলেও বাংলাদেশে তা মাত্র ০.৪ শতাংশ।
কৃষিবিদ ড. শহিদুল্লাহ শরীফ জানান, প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য বরাদ্দ মোট বাজেটের মাত্র ০.২৯ শতাংশ, যা ১৮-২০ কোটি মানুষের প্রোটিন চাহিদা মেটাতে অত্যন্ত অপ্রতুল বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি পোল্ট্রি খাতের বর্তমান সঙ্কট তুলে ধরে বলেন, উৎপাদন খরচ প্রায় ২১০ টাকা হলেও বাজারে মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৫০-১৮০ টাকায়, ফলে খামারিরা প্রতি কেজিতে লোকসান গুনছেন।
প্রতিরক্ষা ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব দিয়ে কৃষিবিদ ড. মিজানুর রহমান কৃষক ও গার্মেন্ট শ্রমিকদের অর্থনীতিতে অবদানের কথা তুলে ধরে বলেন, রফতানি আয়ের সিংহভাগ আসে গার্মেন্টস শ্রমিকদের মাধ্যমে এবং দেশের খাদ্য জোগান দেন কৃষকরা। তিনি বঙ্গোপসাগর ও সেন্ট মার্টিনের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রতিরক্ষা খাত শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
বিপণন ব্যবস্থা ও সংরক্ষণের ঘাটতি উল্লেখ করে ব্যারিস্টার এসএম শাহরিয়ার কবির এই বাজেটকে ‘ধোঁকাবাজির বাজেট’ আখ্যা দিয়ে বলেন, সিএস খতিয়ান অনুযায়ী দেশে ৩৩০০ নদী থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে নদীর সঙ্কট কৃষিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তিনি জানান, চালের বাজার মাত্র দুই-তিনজন ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে এবং নওগাঁর অটোমেটিক রাইস মিলগুলোর ৯৫ শতাংশই ঋণখেলাপি। সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে নওগাঁর আম-কাঁঠাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, অথচ থাইল্যান্ড থেকে আমদানিকৃত ফল মাসের পর মাস সংরক্ষিত থাকে। তিনি তিস্তা প্রকল্পে চীনের ১২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রস্তাব রাজনৈতিক কারণে বিলম্বিত হওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেন এবং জমি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সহজীকরণের প্রস্তাব দেন।
তামাক চাষ, সার সঙ্কট ও আমদানি নির্ভরতা বিষয়ে ড. শরিফুল আলম বলেন, সরকার খাদ্য নিরাপত্তার চেয়ে তামাক চাষকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে এবং তিন ফসলি জমিতেও তামাক চাষের অনুমতি দেয়া হয়েছে, যা উদ্বেগজনক। তিনি জানান, দেশের ছয়টি সার কারখানার মধ্যে মাত্র একটি সচল এবং চাহিদার তুলনায় উৎপাদন প্রায় অর্ধেক। তিনি আরো জানান, দেশ গম, চিনি, সয়াবিন ও পাম অয়েলের জন্য প্রায় সম্পূর্ণভাবে আমদানির ওপর নির্ভরশীল, অথচ দেশীয় তেলবীজ চাষে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন এএফবি মহাসচিব কৃষিবিদ শেখ মুহাম্মদ মাসুদ। সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি ও সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার ড. এটিএম মাহবুব ই ইলাহী। সঞ্চালনায় ছিলেন কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মো: মিজানুর রহমান। প্যানেল আলোচক হিসেবে আরো উপস্থিত ছিলেন প্রফেসর ড. ফিরোজ মাহমুদ, সাবেক সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ সফিউল্লাহ, সাবেক সচিব নূরুল আলম ও ড. শরীফুল আলম জিন্নাহ, কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির সভাপতি আহসানউজ্জামান লিণ্টু, প্রফেসর ড. সুজাহাঙ্গীর কবির সরকার, ড. ফজলুল হক এবং সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (ব্রি) ড. মোশাররফ হোসেন।