ব্যাংকিং খাতে অনিয়মের কারণ উদঘাটনে ‘ট্রুথ ও রিকনসিলিয়েশন’ কমিশন গঠন করুন : লুৎফে সিদ্দিকী

খেলাপিদের অর্থনীতিতে ফেরার সুযোগ দেয়া যাবে না

Printed Edition
back-1
পিআরআই আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে লুৎফে সিদ্দিকী বক্তব্য রাখেন : নয়া দিগন্ত

বিশেষ সংবাদদাতা

ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম ও খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার কারণ উদঘাটনে একটি ‘ট্রুথ ও রিকনসিলিয়েশন’ কমিশন গঠনের সুপারিশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়সংক্রান্ত বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী। তিনি বলেছেন, ‘আমরা জানিই না যে কাকে আমরা টাকা ধার দিয়েছি। অর্থনৈতিক অপরাধ ও খেলাপি ঋণ এবং কিভাবে এসব ঋণ সৃষ্টি হয়েছে, এসবের জন্য আমাদের একটি ট্রুথ ও রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠন করতে হবে।’

গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকায় পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) আয়োজিত ‘ব্যাংকগুলোর ব্যর্থতা ও রেজুলিউশনে উদ্যোগ ও চ্যালেঞ্জ’ নিয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে লুৎফে সিদ্দিকী এ মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পিআরআই চেয়ারম্যান জায়েদি সাত্তার।

লুৎফে বলেন, ব্যাংকিং খাত যদি আগের মতোই চলতে থাকে, তাহলে কোনো পরিবর্তন আসবে না। কোন রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করবে তা নির্বিশেষে সুশাসন নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক।

অনুষ্ঠানে প্রাইম ব্যাংকের চেয়ারম্যান তানজীল চৌধুরী বলেন, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের অর্থনীতিতে ফেরার কোনো সুযোগ দেয়া যাবে না। তাদের নতুন করে কোনো অর্থায়ন করা যাবে না। পরিচালক হতে ২ শতাংশের সীমা বাতিল করে পরিবারের শেয়ারের সীমা নির্ধারণ করে দিতে হবে।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশে কোনো ব্যাংককে ব্যর্থ হতে দেয়া যাবে না। পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার যে উদ্যোগ নেয়া আছে, এটা ঠিক আছে। অর্থনীতি আরো বড় হচ্ছে, এখানে ব্যাংকের প্রয়োজন আছে।

মাসরুর আরেফিন আরো বলেন, অতীতে অনেক খারাপ ব্যাংক এখন দেশের ভালো ব্যাংক হিসেবে গড়ে উঠেছে। সিটি ব্যাংক তার অন্যতম। বিসমিল্লাহ গ্রুপ প্রাইম ব্যাংক খেয়ে ফেলেছিল, এই ব্যাংক এই বছর এক হাজার কোটি টাকার মুনাফা করবে।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনা করেন পিআরআইয়ের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘ব্যাংকিং রেজুলিউশন অর্ডিন্যান্স পাস হওয়া কাজের অর্ধেক মাত্র। এর বাস্তবায়নের জন্য এখন প্রয়োজন কার্যকর প্রক্রিয়া, সিস্টেম এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় বিনিয়োগ-যা বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক খাতকে রেজুলিউশন রেজিম কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে সহায়তা করবে। সুশৃঙ্খলভাবে ব্যাংক রেজুলভ করা, সঙ্কটাপন্ন ব্যাংকগুলো দক্ষতার সাথে পরিচালনা করা এবং আমানতকারীদের সুরক্ষার পাশাপাশি পদ্ধতিগত ঝুঁকি কমানোর সক্ষমতা না থাকলে এই অর্ডিন্যান্স কাগুজে প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে। বাস্তব কাজ হলো অপারেশনাল সক্ষমতা গড়ে তোলা: তদারকি সরঞ্জাম, মূল্যায়ন দক্ষতা, পুনরুদ্ধার ব্যবস্থাপনা এবং স্পষ্ট সিদ্ধান্ত প্রোটোকল-যা আস্থা পুনরুদ্ধার করবে এবং আর্থিক ব্যবস্থায় নতুন গতি সঞ্চার করবে। তখনই এই অর্ডিন্যান্স তার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারবে-স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং একটি শক্তিশালী, আরো দৃঢ় ব্যাংকিং খাতের ভিত্তি স্থাপন।’

সভাপতির বক্তব্যে পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার বলেন, ‘অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ৩৫ শতাংশে পৌঁছানো এক অভূতপূর্ব ঘটনা-যা বৈশ্বিক আর্থিক সঙ্কটে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতেও দেখা যায়নি এবং এটি কিভাবে ঘটল তা বিশ্লেষণমূলকভাবে বোঝা জরুরি।

তিনি বলেন, তবে ইতিবাচক দিক হলো-ব্যাংকিং খাতের রক্তক্ষরণ থেমে এসেছে এবং কিছুটা স্থিতিশীলতা দেখা যাচ্ছে। আমি আশা করি আগামী বছর প্রায় ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে। এর জন্য আগামী ফেব্রুয়ারিতে একটি সুন্দর, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন জাতির জন্য এক বড় উপহার হবে বলে আমি মনে করি। এরপর একটি নির্বাচিত সরকার আসবে- যারা প্রত্যাশা অনুযায়ী অর্থনৈতিক নীতি পরিচালনা করবে।’