পুতিনের নয়াদিল্লি সফর
মার্কিন নিষেধাজ্ঞায়ও জ্বালানি সরবরাহে মোদিকে প্রতিশ্রুতি পুতিনের
Printed Edition
- প্রতিরক্ষা সম্পর্ক পুনর্গঠনে সম্মত দুই নেতা
- ২০৩০ সাল পর্যন্ত অর্থনৈতিক সহযোগিতা কর্মসূচিতে ঐকমত্য
আলজাজিরা
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ঘোষণা করেছেন, মস্কো ভারতকে নিরবচ্ছিন্নভাবে জ্বালানি সরবরাহ করতে প্রস্তুত। নয়াদিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে অনুষ্ঠিত শীর্ষ বৈঠকে তিনি এ প্রতিশ্রুতি দেন। বৈঠকে দুই নেতা প্রতিরক্ষা সহযোগিতা পুনর্গঠনের অঙ্গীকারও করেছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে ভারতকে স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে।
পুতিন বলেন, ‘রাশিয়া তেল, গ্যাস, কয়লা এবং ভারতের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের জ্বালানির নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী।’ তিনি আরো যোগ করেন, ‘আমরা ভারতের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখতে প্রস্তুত।’
এ বৈঠক ছিল ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পুতিনের প্রথম ভারত সফর। মোদি পুতিনকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা সবসময়ই ভারত-রাশিয়া অংশীদারিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।’ যদিও তিনি পারমাণবিক শক্তির প্রসঙ্গ তুলেছেন, রাশিয়ান তেল ক্রয়ের বিষয়ে সরাসরি কিছু বলেননি। এর আগে রাশিয়ান তেল আমদানির কারণে যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল।
দুই নেতা ২০৩০ সাল পর্যন্ত অর্থনৈতিক সহযোগিতা কর্মসূচিতে সম্মত হয়েছেন। এতে কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, শিপিং ও রাসায়নিক খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চুক্তি বিনিময় হয়েছে। পুতিনের সফরকে ঘিরে রাশিয়া-ভারত বাণিজ্যকে ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ২০২৪ সালে সর্বোচ্চ ৬৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল।
গতকাল শুক্রবার সকালে পুতিন রাষ্ট্রপতি ভবনে ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সাথে সাক্ষাৎ করেন। এরপর তিনি রাজঘাটে গিয়ে মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে হায়দরাবাদ হাউজে মোদির সাথে বৈঠক করেন। সফরকে ঘিরে ব্যাপক আয়োজন করা হয়েছিল। বৃহস্পতিবার মোদি নিজে বিমানবন্দরে গিয়ে পুতিনকে আলিঙ্গন ও করমর্দন করে স্বাগত জানান এবং ব্যক্তিগত নৈশভোজে আপ্যায়ন করেন।
পুতিনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ২০২৩ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালে শিশুদের অবৈধভাবে স্থানান্তরের অভিযোগে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিল। তবে ভারত আইসিসির সদস্য নয়, ফলে পুতিন কোনো ঝুঁকি ছাড়াই সফর করতে পেরেছেন।
রাশিয়া-ভারতের কৌশলগত অংশীদারিত্বের ইতিহাস ২৫ বছরের। তবে ইউক্রেন যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা ভারতের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ান তেল আমদানি কমালেও ভারত তা বাড়িয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র আগস্টে ভারতীয় পণ্যে শুল্ক দ্বিগুণ করে ৫০ শতাংশে উন্নীত করে। নভেম্বর থেকে রাশিয়ান কোম্পানি রসনেফট ও লুকঅয়েলের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়, যা ভারতের মোট তেল আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশের উৎস। ভারত অভিযোগ করেছে, পশ্চিমা দেশগুলো নিজেদের স্বার্থে রাশিয়ার সাথে ব্যবসা চালালেও ভারতকে অন্যায়ভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
পুতিন ভারতীয় সাংবাদিকদের বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র নিজেই আমাদের কাছ থেকে পারমাণবিক জ্বালানি কিনছে। যদি তাদের অধিকার থাকে, তবে ভারতেরও একই অধিকার থাকা উচিত।’ তিনি আরো ইঙ্গিত দেন, রাশিয়া ভারতকে আরো অস্ত্র বিক্রি করতে চায়। বিশেষ করে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও সু-৫৭ যুদ্ধবিমান নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যদিও কোনো চুক্তি হয়েছে কি না তা স্পষ্ট নয়।
পুতিনের সফরের কয়েক দিন আগে তিনি মস্কোতে মার্কিন প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করেন, যেখানে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা হয়। যদিও কোনো অগ্রগতি হয়নি, উভয় পক্ষই আলোচনাকে ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেছে। ভারত এ যুদ্ধে রাশিয়াকে প্রকাশ্যে নিন্দা না করে শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানিয়ে আসছে।