রাঙ্গামাটিতে বিপন্ন প্রতিবেশ

পর্বত দিবসে পাহাড় বাঁচানোর আহ্বান

Printed Edition
back-4
সবুজে ঢাকা রাঙ্গামাটির বিস্তৃত পাহাড়ী এলাকা : নয়া দিগন্ত

পুলক চক্রবর্তী রাঙ্গামাটি

আজ ১১ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক পর্বত দিবস। পাহাড়-পরিবেশ রক্ষা এবং টেকসই পাহাড় ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব তুলে ধরতেই প্রতি বছর এ দিবস পালিত হয়। পাহাড় কাটা, বন নিধন ও অপরিকল্পিত বসতির কারণে ঝুঁকি বাড়ছে মানুষের জীবন ও প্রকৃতির।

রাঙ্গামাটির সবুজ পাহাড়,কৃত্রিম কাপ্তাই লেক আর ঝরনাময় নৈসর্গিক সৌন্দর্য বহু বছর ধরে রেখেছে পার্বত্য চট্টগ্রামকে। কিন্তু জনসংখ্যার চাপ, বেপরোয়া পাহাড় কাটা আর নির্বিচারে বন উজাড়ে আজ বিপন্ন এই পাহাড়।

বনজসম্পদ আহরন,পাথর উত্তোলন আর অপরিকল্পিত বসতি শুধু পাহাড়কেই বিপন্ন করেনি; বর্ষায় ভূমিধসেও প্রাণহানি বাড়ছে। পাহাড় ধসের কারণে সীতারাম পাহাড়সহ কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান ও রাঙ্গামাটির অসংখ্য পাহাড়ই আজ বিপর্যয়ের মুখে। এতে যেমন কমছে জীববৈচিত্র্য, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি, পর্যটন আর স্থানীয় অর্থনীতি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাহাড়গুলোর সঠিক সমীক্ষা নেই। জরুরি ভিত্তিতে সার্ভে হলে পাহাড় রায় সরকার-বেসরকারি উদ্যোগ আরো কার্যকর হবে। পরিবেশ রক্ষায় নীতিমালা থাকলেও এর বাস্তব প্রয়োগ সীমিত, বলছেন নাগরিক সমাজ ।

রাঙ্গামাটি পাবলিক কলেজের অধ্যাপক মুকুল কান্তি ত্রিপুরা বলেন, পাহাড় লেক গিরি ঝরনার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নৈসর্গিক লীলাভূমি পার্বত্য চট্টগ্রাম। এই পাহাড় আছে বলে পার্বত্য অঞ্চল অনেক সুন্দর । এখানের পাহাড়গুলোর যে সমীক্ষা হওয়া দরকার সে সমীক্ষা এখনো আমরা পাইনি। যেটা সবচেয়ে জরুরি বর্তমান সময়ে এ সমীক্ষাটা করে ফেলা দরকার। এর মাধ্যমে যথাযথ তথ্য থাকলে তাহলে আমরা তা রক্ষা করতে পারি সবাই মিলে। সরকারি-বেসরকারি প্রশাসনের পক্ষ থেকে সে প্রচেষ্টা আমরা নিতে পারি।

রাঙ্গামাটি জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি সভাপতি ওমর ফারুক বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিবেশ প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার ক্ষেত্রে পাহাড়ের অনন্য সাধারণ ভূমিকা আছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা এ প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগাতে পারছি না। এখানে পাহাড় ও পরিবেশ এর যথেচ্ছার ভাবে ব্যবহার হচ্ছে। চমৎকার সব নীতিমালা আছে কিন্তু এর বাস্তবিক প্রয়োগ সব সীমিত। সরকারি পর্যায়ে যখন পাহাড় কাটা হয় কিংবা পরিবেশকে নিধন করা হয় তখন বিষয়টা আমাদের দুঃখ দেয়, যা খুবই পীড়াদায়ক। এটি কোনো অবস্থাতেই কাম্য নয়। আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদকে রক্ষা করতে হবে এবং এটাকে যথপোযুক্ত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এটাকে ব্যবহার করতে হবে। বিল্ডিং কোড থেকে শুরু করে পাহাড়ে স্থাপত্য নির্মাণের যে কৌশল আছে সে কৌশলগুলো অবলম্বন করতে হবে। আইনের সঠিক প্রয়োগ করতে হবে। এবং ইটের বিষয়ে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।

জনসংখ্যার চাপ সামাল দিতে পাহাড়ের ভূ-প্রকৃতি বদলে যাচ্ছে। পরিকল্পনা ছাড়া আবাসন নির্মাণ ও বনজসম্পদ আহরণ পাহাড়ের প্রতিবেশ নষ্ট করছে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সাসের নির্বাহী পরিচালক ললিত সি চাকমা বলেন, পাহাড়েরর সৌন্দর্য ঘিরেই পার্বত্য চট্টগ্রাম। দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার একটা বিশাল চাপ এ পাহাড়েরর ওপরেও পড়েছে। বর্ধিত এ চাপ সামালানোর জন্য পাহাড়ের বিদ্যমান ভূ প্রকৃতি এটা নানা দিকে থেকে পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। পাহাড়কে রক্ষা করতে হলে মানুষের যে আবাসনের প্রয়োজন তার জন্য একটা পরিকল্পনা থাকা দরকার নির্বিচারে বনজ সম্পদ ও পাথর আহরণের ফলে পাহাড়ের প্রতিবেশ বিঘিœত হচ্ছে।

পরিবেশ অধিদফতর রাঙ্গামাটির সহকারী পরিচালক মো: মোমিনুল ইসলাম, বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম হলো পাহাড়ি এলাকা। এখানের ভূমি গঠন ৯০ ভাগই উঁচু পাহাড় নিয়ে রাঙ্গামাটি খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলা গঠিত। দেশের ১৬টি জেলায় পাহাড় রয়েছে। পুরো বাংলাদেশে ১৫ লাখ ৪১ হাজার হেক্টর পাহাড়ি ভূমি রয়েছে। এর মধ্যে রাঙ্গামাটি জেলায় উঁচু-নিচু মিলে রয়েছে ৪ লাখ ৭৫ হাজার হেক্টর পাহাড়ি এলাকা ও পাহাড়ি ভূমি। এর মধ্যে ৮১ হাজার ৬০ হেক্টর উঁচু পাহাড়। ইতঃপূর্বে পাহাড় রক্ষায় পরিবেশ অধিদফতরের বিভিন্ন কার্যক্রম বিভাগীয় চট্টগ্রাম থেকে পরিচালিত হতো। ২০২৪-এর নভেম্বর থেকে রাঙ্গামাটি থেকে পরিবেশ অধিদফতরের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। পাহাড় রায় জনসচেতনতামূল কার্যক্রম অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছে। এর পাশাপাশি আইনেরও প্রয়োগ করা হচ্ছে। চলতি বছরে পাহাড় কাটা ঘটনায় বিভিন্ন স্থান থেকে ২৩ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। এছাড়া পাহাড় কাটার ঘটনায় গত ৬ মাসে ১৯টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।