ইসরাইলি দখলদারিত্ব শেষ হলেই অস্ত্র ছাড়বে হামাস

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • অস্ত্রবিরতির মধ্যেও জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম ঢুকতে দিচ্ছে না ইসরাইল
  • পথে পথে গাজার অসহায় শিশুরা

গাজায় ইসরাইলি দখলদারত্ব শেষ হলে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের কাছে অস্ত্র সমর্পণ করবে উপত্যকাটির প্রতিরোধ সংগঠন হামাস। গত শনিবার এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে সংগঠনটির আলোচক দলের প্রধান খলিল আল-হায়া। সূত্র : ফ্রান্স ২৪।

তিনি বলেন, ‘দখলদারি ও আগ্রাসনের কারণেই আমরা অস্ত্রশস্ত্র রাখছি। দখলদারির অবসান ঘটলে এসব অস্ত্র রাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয়া হবে।’ রাষ্ট্র বলতে একটি সার্বভৌম ও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কথা বুঝিয়েছেন বলে আল-হায়ার দফতর জানিয়েছে। খলিল আল-হায়া আরো বলেন, ‘আমরা গাজায় যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ এবং সীমান্তে নজরদারির জন্য জাতিসঙ্ঘের বাহিনী মোতায়েনের প্রস্তাব মেনে নিয়েছি। তবে শুধু হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের লক্ষ্যে কোনো আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন করা হলে, তা মেনে নেয়া হবে না।’

গত ১০ অক্টোবর থেকে গাজায় যুদ্ধবিরতি চললেও তা লঙ্ঘন করে থউপত্যকাটিতে হামলা চালানো ইসরাইলের নিত্যদিনের ঘটনা। এতে প্রতিদিন হতাহত হচ্ছেন অনেকে। স্থানীয় সময় শনিবার ‘ইয়েলো লাইন’ অতিক্রমের অভিযোগে আবারো নিরীহ ফিলিস্তিনিদের ওপর গুলি ছোঁড়ে নেতানিয়াহু সেনারা। পূর্বাঞ্চলে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিভিন্ন স্থাপনা। প্রাণ বাঁচাতে শহরের অন্য প্রান্তে আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন বাসিন্দারা। একই দিন, পশ্চিম তীরের বাসিন্দাদের ওপর হামলা চালায় অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা। এ দিকে রাফাহ সীমান্ত একপক্ষীয়ভাবে খুলে ফিলিস্তিনিদের মিসরে স্থানান্তরের পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছেন মুসলিম দেশের নেতারা। দোহায় এক সম্মেলন শেষে যৌথ বিবৃতিতে দেশগুলো জানায়, ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া চুক্তি অনুযায়ী রাফাহ সীমান্ত দুই দিক থেকেই খুলে দেয়া উচিত। একই সাথে ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূখণ্ডে থেকে তা পুনর্নির্মাণের বিষয়েও সহমত জানান তারা।

অস্ত্রবিরতির মধ্যেও জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম ঢুকতে দিচ্ছে না ইসরাইল

গাজায় দুই মাস ধরে অস্ত্রবিরতি চলছে, কিন্তু তবুও মানবিক পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। বরং ইসরাইল জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম আটকে রাখায় গাজার ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরো সঙ্কটে পড়েছে। অ্যান্টিবায়োটিক, স্যালাইন, অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী- কোনোটাই ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। অথচ তুলনামূলকভাবে অপ্রয়োজনীয় সামগ্রী যেমন মিষ্টি, মোবাইল ফোন, ইলেকট্রিক সাইকেল- এসব প্রবেশের অনুমতি পাচ্ছে।

আলজাজিরা জানায়, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ডা: মুনির আল-বুরশ জানিয়েছেন, বর্তমানে গাজায় ৫৪ শতাংশ জরুরি ওষুধ সম্পূর্ণ ফুরিয়ে গেছে। সার্জারি এবং জরুরি চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধের ৪০ শতাংশ নেই। সরকারিভাবে সপ্তাহে মাত্র পাঁচটি ট্রাকে সীমিত চিকিৎসা উপকরণ ঢুকতে দেয়া হয়, যার মধ্যে দু’টি সরকারি হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ। অস্ত্রবিরতি চুক্তি অনুযায়ী প্রতিদিন ৬০০ ট্রাক ঢোকার কথা হলেও বাস্তবে প্রবেশ করছে মাত্র অতি সামান্য। আলজাজিরার খবরে জানা যায়, রান্নার গ্যাস বর্তমানে প্রয়োজনের মাত্র ১৬ শতাংশ পাওয়া যাচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্র, তাঁবু, ত্রিপল- কিছুই পর্যাপ্ত নয়। মানুষ শীতের মধ্যে আগুন জ্বালানোর জন্য কাঠ, কার্টন-যা পায় তাই সংগ্রহ করছে। দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় ভোগা মানুষগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। নুসাইরাত শরণার্থী শিবিরের ক্যান্সার রোগী নাইফ মুসবাহ বলেন, কোলস্টোমি ব্যাগ, গজ, জীবাণুনাশক- কিছুই পাওয়া যায় না। মানবিক সঙ্কট তার মর্যাদাকে আঘাত করছে। চিকিৎসকরাও সীমাহীন সঙ্কটে পড়েছেন। অনেক হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের উপকরণ না থাকায় রোগীদের বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়েছে। গত দুই বছরে ইসরাইলি হামলায় গাজার ৩৪টি হাসপাতালসহ ১২৫টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিহত হয়েছেন ১,৭০০-এর বেশি স্বাস্থ্যকর্মী। অস্ত্রবিরতির মধ্যেও ইসরাইলের ৬০০টিরও বেশি লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।

পথে পথে গাজার অসহায় শিশুরা

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার রাস্তায় থার্মোস হাতে হাঁটছে কিশোর মোহাম্মদ আশুর। পথচারীদের কাছে এক কাপ কফি বিক্রির জন্য সারা দিন দাঁড়িয়ে থাকে সে। রাস্তার এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত ছুটে বেড়ায়। ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ঘরে খাবার নেই। পেটে দানাপানি নেই।

১৫ বছরের মোহাম্মদ এখন স্কুলে সহপাঠীদের সাথে থাকার কথা। কিন্তু ইসরাইলের হামলায় বাবা নিহত হওয়ার পর তাকে পড়াশোনা ছেড়ে এই বয়সেই হাল ধরতে হয়েছে সংসারের। পরিবারের প্রধান উপার্জনকারীর ভূমিকা নিতে হয়েছে। এই গল্প শুধু মোহাম্মদের নয় বরং গাজার প্রতিটি গলিতেই মিলবে এমন কিশোর। পেটের দায়ে পথে পথে শ্রম দিচ্ছে গাজার এমন হাজারো শিশুর। এ দৃশ্য এখন গাজার নিত্যদিনের।

দুই বছরেরও (৭ অক্টোবর ২০২৩ থেকে) বেশি সময় ধরে চলা ইসরাইলের নৃশংস হামলায় গাজার অন্তত ৩৯ হাজার শিশু এতিম হয়ে গেছে। কেউ শুধু মা অথবা বাবা; কেউ হারিয়েছে দুজনকেই! বিধ্বস্ত অর্থনীতিতে এখন আট বছরের শিশুরাও পরিবারের জন্য কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। হারাচ্ছে শিক্ষা ও শৈশব। মোহাম্মদের মা আতাদ আশুর জানালেন, ‘ছেলের পড়াশোনা বন্ধ হওয়া তাদের নিজের ইচ্ছা নয়। ওর বাবা নিহত হওয়ার পর আমাদের আর কোনো আয় ছিল না। ও এখনো শিশু। পরিস্থিতিই আমাদের এ দিকে ঠেলে দিয়েছে।’ জাতিসঙ্ঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) মুখপাত্র টেস ইংগ্রাম বলেন, ‘আমরা দেখছি, শিশুরা আবর্জনার স্তূপে কাঠের টুকরো খুঁজে বেড়াচ্ছে বিক্রি করার জন্য। কেউ আবার কফি বিক্রি করছে।’ রামাল্লা থেকে সেভ দ্য চিলড্রেনের গাজা মানবিক সহায়তা পরিচালক রাচেল কামিংস বলেন, যুদ্ধ পরিবার কাঠামো ভেঙে দিয়েছে। ফলে শিশুদের ভাইবোন বা বৃদ্ধ সদস্যদের দেখভালের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, ‘গাজার পরিবার ব্যবস্থা পুরোই বিপর্যস্ত। শিশুরা সবচেয়ে অসহায়।’ সেভ দ্য চিলড্রেনের তথ্য অনুযায়ী-অবরুদ্ধ গাজার ৬ লাখ ৬০ হাজারের বেশি শিশু এখন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। এ ছাড়াও প্রায় এক লাখ ৩২ হাজার শিশু চরম অপুষ্টিতে ভুগছে।

গাজা নিয়ে নেতানিয়াহু-টনি ব্লেয়ার গোপন বৈঠক

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত সপ্তাহে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের সাথে গোপনে বৈঠক করেছেন। শনিবার ইসরাইলের পাবলিক ব্রডকাস্টার কেএএন নিউজ এ তথ্য প্রকাশ করে। খবরে বলা হয়, গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে দু’জনের মধ্যে আলোচনা হয়। তবে বৈঠকের বিষয়ে নেতানিয়াহুর কার্যালয় কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। কেএএনের সূত্রগুলো জানায়, ব্লেয়ার গাজা উপত্যকার নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় পিএ-কে সীমিত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দেয়ার সম্ভাবনা নিয়ে নেতানিয়াহু ও বিভিন্ন আরব রাষ্ট্রের সাথে আলোচনা করছেন। এটি প্রাথমিকভাবে একটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে শুরু হতে পারে এবং সফল হলে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোয় রূপ নিতে পারে। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজার যুদ্ধ-পরবর্তী প্রশাসনের নেতৃত্বদানের দায়িত্ব নিতে ব্লেয়ারকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু ৭ নভেম্বর ফিলিস্তিনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তাদের দাবি, এ ধরনের ব্যবস্থায় গাজা পশ্চিমা বোর্ডের অধীনে চলে যাবে, যা ব্রিটিশ ম্যান্ডেট যুগের অবস্থা ফিরিয়ে আনবে। এ ছাড়া ২৩ নভেম্বর ব্লেয়ার ফিলিস্তিনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হুসেইন আল-শেখের সাথে দেখা করে গাজা যুদ্ধ-পরবর্তী প্রশাসন, পশ্চিম তীর ও সম্ভাব্য ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা করেন। আল-শেখ এক্সে দেয়া পোস্টে এ তথ্য জানান। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় গাজায় ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। আহত হয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৭১ হাজার মানুষ।

সঙ্কট অবসানে বড় বাজেটের অনুমোদন ইসরাইলের

ইসরাইলি মন্ত্রিসভা ২০২৬ সালের বাজেট অনুমোদন করেছে, সামরিক খাতে ৩৫ বিলিয়ন ডলার (১১২ বিলিয়ন শেকেল) বরাদ্দ করেছে, যা প্রাথমিক খসড়ার চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি। ইরানের সংবাদমাধ্যম পার্সটুডে জানায়, ২০২৬ সালের জন্য ইসরাইলি শাসক গোষ্ঠীর নজিরবিহীন সামরিক বাজেট অনুমোদন শক্তির লক্ষণ নয়। বরং গাজা ও লেবাননে যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট ব্যাপক ক্ষতিপূরণ, গুরুতর সরঞ্জামের ঘাটতি দূরীকরণ এবং গভীর অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি জরুরি প্রতিক্রিয়া। এই ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি এমন এক সময়ে এসেছে যখন তেল আবিব সামরিক ক্ষেত্রে তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি এবং অভ্যন্তরীণভাবে ক্ষমতাসীন জোটের পতনের ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে।

ইসরাইলি শাসক গোষ্ঠীর ২০২৬ সালের বাজেট অনুমোদন, সামরিক খাতে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি, প্রথম নজরে এই অঞ্চলে আরো শক্তি প্রদর্শনের দৃঢ সঙ্কল্পের প্রদর্শন বলে মনে হচ্ছে। তবে ঘনিষ্ঠভাবে পরীক্ষা করলে এই পদক্ষেপটি এক বছরের ব্যয়বহুল এবং নিষ্ফল যুদ্ধের শাসক গোষ্ঠীর জরুরি পরিস্থিতি এবং ক্রমবর্ধমান দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। সামরিক বাজেট বৃদ্ধি মূলত যুদ্ধে ইসরাইলি শাসক গোষ্ঠীর বিস্ময়কর ব্যয় এবং কৌশলগত ব্যর্থতার সরাসরি প্রতিক্রিয়া। প্রতিবেদন অনুসারে, গত বছরেই ইসরাইল গাজা এবং লেবাননের ফ্রন্টে ৩১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ব্যয় করেছে। যুদ্ধ ‘হামাসের সম্পূর্ণ ধ্বংস’ বা দখলকৃত বসতিগুলোর বাসিন্দাদের জন্য নিরাপত্তা পুনরুদ্ধারের প্রাথমিক ঘোষণা তো অর্জন করতে পারেইনি। উল্টো এটি অস্ত্রের মজুদও মারাত্মকভাবে হ্রাস করেছে। রিজার্ভগুলোকে অভূতপূর্ব চাপের মধ্যে ফেলেছে এবং অপারেশনাল সক্ষমতার ব্যাপক পুনর্গঠনের জরুরি প্রয়োজন তৈরি করেছে। নতুন বাজেট আসলে কেবল নিজের ক্ষত নিরাময় করছে, নতুন বিজয়ের পরিকল্পনা করছে না।