দিল্লিতে হাইকমিশনারকে তলব
বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে ভারতের গভীর উদ্বেগ প্রকাশ
Printed Edition
কূটনৈতিক প্রতিবেদক
বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভারত। আর এ উদ্বেগ সম্পর্কে জানাতে দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়েছে। গতকাল তলবে সাড়া দিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (বাংলাদেশ, মিয়ানমার) বি শ্যামের সাথে দেখা করেছেন রিয়াজ হামিদুল্লাহ।
এ দিকে নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় গতকাল বেলা ২টা থেকে রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কে অবস্থিত ভারতীয় ভিসা আবেদনকেন্দ্র বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়।
তলবের ব্যাপারে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশে ক্রমাবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে দিল্লির গভীর উদ্বেগ জানাতে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে তলব করেছে। এ সময় বাংলাদেশে কিছু চরমপন্থী গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের প্রতি হাইকমিশনারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়, যারা ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশন ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ করার পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা ঘিরে চরমপন্থী মহল যে ভুয়া বয়ান তৈরির চেষ্টা করছে, ভারত তা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করছে। দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এসব ঘটনার বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করেনি কিংবা ভারতের সাথে অর্থবহ কোনো তথ্যপ্রমাণও বিনিময় করেনি।
ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বাংলাদেশের জনগণের সাথে ভারতের ঘনিষ্ঠ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এর ভিত্তি গড়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সংগ্রামে, যা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক ও জনগণের সাথে জনগণের যোগাযোগের উদ্যোগের মাধ্যমে আরো সুদৃঢ় হয়েছে। বাংলাদেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে ভারত রয়েছে। বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অবাধ, সুষ্ঠু, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানিয়ে আসছে ভারত। কূটনৈতিক বাধ্যবাধকতার আলোকে বাংলাদেশে অবস্থিত বিভিন্ন ভারতীয় মিশন ও পোস্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, এমনটাই অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দিল্লি প্রত্যাশা করে।
এ দিকে ঢাকায় ভারতের ভিসা আবেদনকেন্দ্রের (আইভ্যাক) ওয়েবসাইটে নিরাপত্তার কারণে দিনের কার্যক্রম বন্ধের কথা ঘোষণা করা হয়। সেখানে বলা হয়, চলমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে যমুনা ফিউচার পার্ক ঢাকার আইভ্যাক আজ (বুধবার) বেলা ২টায় বন্ধ করা হবে। আজকের দিনে যাদের ভিসা আবেদন জমার স্লট রয়েছে, তাদের পরবর্তী কোনো দিনে স্লট দেয়া হবে।
প্রসঙ্গত, গত বছর আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর নিরাপত্তাজনিত কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত ভারতের ভিসা আবেদনকেন্দ্র দীর্ঘদিন বন্ধ রাখা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে মূলত চিকিৎসা ভিসা দেয়ার জন্য এ সব কেন্দ্র আবারো চালু করা হয়। শেখ হাসিনাসহ জুলাই-আগস্ট গণহত্যার মামলায় সাজাপ্রাপ্তদের দেশে ফিরিয়ে দেয়ার দাবিতে এবং ভারতীয় প্রক্সি রাজনৈতিক দল ও সরকারি কর্মকর্তাদের অব্যাহত ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে ‘মার্চ টু ইন্ডিয়ান হাইকমিশন’ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছিল ‘জুলাই ঐক্য’। গতকাল বিকেলে রামপুরা ব্রিজ থেকে মিছিল নিয়ে ভারতীয় হাইকমিশনের দিকে যাওয়ার পথে উত্তর বাড্ডায় হোসেন মার্কেটের সামনে পুলিশ তাদের আটকে দেয়। এর আগে গত সোমবার শহীদ মিনারে ইনকিলাব মঞ্চ আয়োজিত ওসমান হাদিকে হত্যাচেষ্টার সর্বদলীয় প্রতিরোধ সমাবেশে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করলে ভারতের সেভেন সিস্টার্সকে (উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্য) আলাদা করে দেয়া হবে। তার এই বক্তব্য ভারতের বিভিন্ন মহলে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, যা দেশটির গণমাধ্যমে এসেছে।
গত রোববার ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়েছিল। এ সময় আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচাল করার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ার উসকানি দিয়ে পলাতক শেখ হাসিনাকে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ অব্যাহত রাখায় ভারতের কাছে গুরুতর উদ্বেগ জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। সরকার একই সাথে বাংলাদেশী রাজনৈতিক নেতা শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যার চেষ্টায় জড়িত সন্দেহভাজনদের ভারতে পালানো রোধ করতে এবং যদি তারা ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়, তাহলে তাদের অবিলম্বে গ্রেফতার এবং বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ নিশ্চিত করার জন্য ভারতের সহযোগিতা চেয়েছে।
একই দিন ভারতে পালিয়ে থাকা আওয়ামী লীগ সদস্যরা বাংলাদেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে বলে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনারকে ডেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে অভিযোগ করেছে, তা প্রত্যাখ্যান করেছে দিল্লি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতীম জনগণের স্বার্থের প্রতি বিরূপ হয় এমন কোনো কর্মকাণ্ডে নিজের ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ ভারত কখনো দেয় না। ভারত আশা করে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার শান্তিপূর্ণ উপায়ে নির্বাচন আয়োজনের উদ্দেশ্যে অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে।