মতপার্থক্য ভুলে সরকার ও রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের আভাস

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিরোধী দলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান মতপার্থক্য ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছেন। উভয়েরই উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশ ও মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে গতানুগতিক সঙ্ঘাতের বাইরে গিয়ে ভালো কাজের প্রশংসা এবং গঠনমূলক সমালোচনা করা। সংশ্লিষ্টরা সরকার ও বিরোধী মতের এমন আচরণকে রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তনের আভাস হিসেবে দেখছেন। তারা বলছেন, এমন আচরণ চলমান থাকলে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হওয়াটা দুরূহ হয়ে উঠবে।

সূত্র মতে, গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর সরকার গঠনের আগেই বিরোধীদলীয় নেতাদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর বিরোধী দলীয় নেতাদের বাসায় গিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল দৃশ্য। সাক্ষাতে তিনি দেশ পরিচালনায় বিরোধী দলের সহযোগিতা চেয়েছিলেন। এ সময় বিরোধী নেতারাও বলেছেন, সরকার ও রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনে তারা সংসদে এবং সংসদের বাইরে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে চান। তবে সে ক্ষেত্রে সরকারি দলকেই সর্বোচ্চ ছাড় দেয়ার মানসিকতা দেখাতে হবে।

সরকার গঠনের পর বিরোধী দলগুলোর সাথে এখন পর্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক অব্যাহত রেখেছে বিএনপি। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ইতিবাচক কর্মকাণ্ড ও ভূমিকার কারণে দেশের রাজনীতে পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। গত শনিবার প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর ইফতার মাহফিলে যোগ দিয়ে এক টেবিলে ইফতার করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ ছাড়া সরকারের উচ্চ পর্যায়ের মন্ত্রী ও নেতারাও যোগ দিয়েছেন সেই কর্মসূচিতে। একই দিন আরেক বিরোধী দল এনসিপির ইফতার মাহফিলেও যোগ দিয়েছেন সরকারের মন্ত্রীসহ বিএনপির শীর্ষ নেতারা। এই পরিবর্তন কেবল সরকার পরিবর্তনের বিষয় নয় বরং দীর্ঘ দেড় দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অপসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে একটি মানবিক ও কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত। অনেকেই বলছেন, এর মাধ্যমে গণতন্ত্র সুসংহত হওয়ার পাশাপাশি সরকার ও বিরোধী মতের মধ্যে দূরত্ব যেমন কমবে ঠিক একইভাবে অন্যান্য সূচকে দেশ এগিয়ে যাবে।

এ দিকে ঐক্য ও সৌহার্দ্যকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের উন্নয়নমুখী রাজনীতি নজর কাড়ছে সবার। কাজের প্রতি নিষ্ঠা, শনিবার সরকারি ছুটির দিনেও অফিস করা, সরকারি গাড়ি, জ্বালানি ব্যবহার না করা, সাধারণের ন্যায় জীবনযাপন, এগুলো মানুষকে ইতিবাচক রাজনীতির দিকে ধাবিত করছে। দলমত নির্বিশেষে দেশের স্বার্থে সকলকে একসাথে নিয়ে কাজ করার যে ইচ্ছে, সেটি প্রশাংসা পাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর এই নতুন ধারার রাজনীতি বাংলাদেশে ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সরকার ও রাজনীতিতে গতানুগতিক ধারার বদলে নীতি-নৈতিকতা, সুশাসন ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে গুণগত পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি সৃষ্টির প্রচেষ্টা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

সূত্র মতে, রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে নানা উত্থান-পতনের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করেছে। ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। কিন্তু ভাগ্যের তেমন পরিবর্তন হয়নি। নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো নতুন এক আলোর রেখা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ক্ষমতায় আসার পর তার আচরণ, সিদ্ধান্ত ও বার্তায় একটি গুণগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। নেতৃত্ব যদি সরলতা, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তবে তা ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। ক্ষমতারোহণের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন- বিএনপির সংসদ সদস্যরা শুল্কমুক্ত গাড়ি নেবেন না, সরকারি প্লট গ্রহণ করবেন না। বাংলাদেশে উচ্চপদস্থ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিদের জন্য এসব সুবিধা যেন এক প্রাতিষ্ঠানিক প্রথায় পরিণত হয়েছিল। সেই প্রথার বাইরে এসে নিজেরাই বিশেষ সুবিধা প্রত্যাখ্যান করা নিছক ব্যক্তিগত বা দলীয় সিদ্ধান্ত নয়, এটি রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করার একটি প্রতীকী পদক্ষেপ। একই সাথে তিনি প্রধানমন্ত্রীর বহরের গাড়ির সংখ্যা কমিয়েছেন, নিরাপত্তা প্রটোকল সীমিত করেছেন। জাতির উদ্দেশে দেয়া প্রথম ভাষণেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী।

দেড় যুগেরও বেশি সময় পর গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরার পর থেকে তার প্রতিটি পদক্ষেপে বিনয়ের প্রকাশ লক্ষ করা গেছে। ১০ জানুয়ারি হোটেল শেরাটনে সম্পাদকদের সাথে মতবিনিময় সভায় এক সাংবাদিক তাকে ‘মাননীয়’ সম্বোধন করলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে অনুরোধ করেন- এভাবে সম্বোধন না করতে। এর মাধ্যমে তিনি ক্ষমতার দম্ভকে ভেঙে চুরমার করে দিয়ে সাধারণ নাগরিক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে প্রথম দিন দূরে দাঁড়িয়ে থাকা এক পুরনো কর্মচারীকে নাম ধরে ডাকা- এটি নিছক আবেগঘন মুহূর্ত নয় বরং এটি তার মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে বনানীতে প্রাণীদের জন্য একটি হাসপাতাল উদ্বোধন করেছেন। রাষ্ট্রের মানবিকতা কেবল মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, পরিবেশ, প্রকৃতি ও প্রাণিকুলের প্রতিও দায়িত্বশীলতা একটি আধুনিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য। তার ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচিতে একটি বিশ্বমানের রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যদি ঘোষিত রূপরেখা বাস্তবায়নে তিনি ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারেন তবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি দায়িত্বশীল, আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে আরো দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

রাজনীতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, ক্ষমতার অহঙ্কার কমিয়ে নাগরিকের কাছে আসার সময় এসেছে। প্রধানমন্ত্রী সেটা শুরু করেছেন। বিরোধীদের সাথে তার সম্পর্ক অবশ্যই প্রশংসনীয়। তিনি নিজেও উদ্যোগী হয়ে অনেক কাজ শুরু করেছেন। সকাল ৯টায় নিজ দফতরে উপস্থিত হয়ে কাজ শুরু করা আপাতদৃষ্টিতে ছোট বিষয় মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে সময়ানুবর্তিতা প্রায়ই উপেক্ষিত। প্রধানমন্ত্রী নিজে যদি নির্ধারিত সময়ে অফিসে উপস্থিত হন, শনিবার ছুটির দিনেও কাজ করেন, তবে সেটি একটি সাংগঠনিক বার্তা বহন করে- রাষ্ট্র পরিচালনা একটি পূর্ণকালীন দায়িত্ব, আনুষ্ঠানিকতা নয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সুশাসনের অভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রে স্বৈরাচারী শাসকের আবির্ভাব ঘটে। আবার স্বৈরশাসকের বিপর্যয় ঘটে এ পথ ধরেই। যেমন সুশাসনের অভাবে ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা প্রাণ রক্ষার্থে দেশ ত্যাগ করে প্রতিবেশী দেশ ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটে। ৮ আগস্ট নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম¥দ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। গণতন্ত্রকামী জনগণ আশা করেছিল গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসবে। পরিবর্তন আসবে বিদ্যমান রাজনৈতিক ধারায়। আশা করা হয়েছিল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যেও পরিবর্তন আসবে। রাজনীতি ফিরে যাবে মানবীয় গুণাবলি সম্পন্ন ব্যক্তিদের অধিকারে। দেশ পরিচালনায় জনগণের আশা আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটবে। তবে জনপ্রত্যাশার সে প্রাপ্তি এবার হয়তো দেখা যেতে পারে।

সরকার ও রাজনীতিতে পরিবর্তন চান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শনিবার রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জামায়াতে ইসলামীর ইফতার মাহফিলে যোগ দিয়ে তিনি বলেছেন, দেশের মানুষ অনেক আশা, প্রত্যাশা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। এ দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য এখন সবাইকে কাজ করতে হবে। গণতন্ত্রের পথ মসৃণ রাখতে সব রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, আসুন, আমরা আল্লাহর নামে শপথগ্রহণ করি যে, আমাদের আগামী দিনের কাজগুলো হবে এই দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য। দেশের মানুষ অনেক প্রত্যাশা নিয়ে, অনেক আশা নিয়ে আমাদের সবার দিকে তাকিয়ে আছে। বিশেষ করে, রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে। আমাদের আগামী দিনের কাজ হবে এই দেশের মানুষের জন্য।

একই অনুষ্ঠানে জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামী গতানুগতিক কোনো বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা রাখবে না বলে জানিয়েছেন দলটির আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, দেশের উন্নয়নে সরকারের যেকোনো উদ্যোগে সহযোগিতা করলেও জনগণের স্বার্থবিরোধী যেকোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করবে জামায়াত। সংসদকে অর্থবহ ও জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করাই তাদের লক্ষ্য। পারস্পরিক সমন্বয় ও সম্মানের ভিত্তিতেই সংসদ এগিয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেন বিরোধী দলীয় নেতা।