ক্ষত না শুকাতেই ফের আঘাত
Printed Edition
- প্রাথমিক হিসাবে বন্যায় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদে ৬৪০ কোটি টাকার ক্ষতি
- বিশেষজ্ঞরা বলছেন অপরিকল্পিত বাঁধ, স্লুইস গেট, মাছের ঘের ও পানি নিষ্কাশনের অব্যবস্থাপনাতেই কুমিল্লা-নোয়াখালী ও চট্টগ্রামে ভয়াবহ বন্যা
- স্থায়ী সমাধান না হলে ভবিষ্যতেও পুনরাবৃত্তি ঘটবে
দুই বছর আগের ভয়াবহ বন্যার ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। সেই ধাক্কা সামলে উঠে যখন এ অঞ্চলের মানুষ নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছিল, ঠিক তখনই আবারো একই ধরনের বন্যায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জনপদ। অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের যৌথ তীব্রতায় কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামসহ ১৩টি জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত। প্রাথমিক সরকারি হিসাব মতে- কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ইতোমধ্যে ৬৪০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এবারের বন্যায় সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে আমন ধানের বীজতলায়, যা আসন্ন আমন মৌসুমে দেশের সামগ্রিক চাল উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার আপদকালীন ব্যবস্থা হিসেবে উঁচু জমিতে নতুন করে চারা উৎপাদন ও তা কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অতিবৃষ্টিকে এই বিপর্যয়ের একক কারণ বলা যাবে না। তাদের মতে, দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত বাঁধ, অকেজো ও অপর্যাপ্ত স্লুইসগেট, খাল-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ সঙ্কুচিত করা, যত্রতত্র মাছের ঘের তৈরি এবং পানি নিষ্কাশনের চরম অব্যবস্থাপনাই এবারের ক্ষয়ক্ষতিকে এতটা ভয়াবহ রূপ দিয়েছে। এখনই স্থায়ী ও সমন্বিত কোনো মহাপরিকল্পনা না নিলে, প্রতি বছরই এ অঞ্চলের মানুষকে এমন কৃত্রিম ও মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে।
৬০০ কোটির ধাক্কা : বিপর্যস্ত ১৬ লাখ মানুষ
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এবারের বন্যায় ১৩টি জেলার ৯২টি উপজেলা এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকার ১৬ লাখের বেশি মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ছয় লাখ মানুষই তাদের মূল জীবিকা অর্থাৎ কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদভিত্তিক খাতের ওপর নির্ভরশীল।
কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক যৌথ সমীক্ষা বলছে, এই তিন খাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৬৪০ কোটি টাকার বেশি। তবে মাঠপর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, উপদ্রুত এলাকাগুলো থেকে পানি পুরোপুরি নেমে না যাওয়া পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত রূপ নির্ণয় করা সম্ভব নয়। পানি নামলে এই ক্ষতির অঙ্ক আরো কয়েক গুণ বাড়তে পারে।
উদ্বেগের বিষয় হলো ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ঠিক একই অঞ্চলে এক ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল, যা দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে একই ভৌগোলিক এলাকায় প্রায় হুবহু একই ধরনের বন্যার পুনরাবৃত্তি দেশের সামগ্রিক পানি ব্যবস্থাপনা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের দূরদর্শিতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক প্রভাব নয়, বরং স্থানীয় পর্যায়ে বছরের পর বছর ধরে চলা পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন ও জবাবদিহিহীনতার ফসল।
কৃষিতে সবচেয়ে বড় আঘাত : মৎস্য খাতে সর্বোচ্চ ক্ষতি
কৃষি মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্যানুযায়ী এবারের বন্যায় দেশের ৪৩টি জেলার মোট এক লাখ ১৪ হাজার ৭২৩ হেক্টর ফসলিজমি বানের পানিতে নিমজ্জিত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়টি ঘটেছে ১০ হাজার ৫০৪ হেক্টর আমনের বীজতলা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে। এর ফলে প্রায় সাড়ে চার লাখ কৃষক সরাসরি চরম আর্থিক ও উৎপাদনমুখী সঙ্কটে পড়েছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো: আবদুর রহিম এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে জানান, ‘বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার। মাঠপর্যায়ের তথ্যানুযায়ী, প্রায় ৫২ হাজার ৭৬৭ হেক্টর আউশ ধান এবং প্রায় ১৭ হাজার ৮০০ হেক্টর জমির শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন সবজি নষ্ট হয়েছে। চলমান আমন বীজতলার প্রায় ৩ শতাংশ পানির নিচে চলে গেছে। পানি নামার পর ক্ষয়ক্ষতির এই গ্রাফ আরো ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে।’
জরুরি পুনর্বাসন পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি জানান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের জরুরি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতি জেলায় ‘কৃষি পুনর্বাসন বাস্তবায়ন কমিটি’র মাধ্যমে সরকারি মালিকানাধীন উঁচু জমিতে অবিলম্বে আমনের চারা উৎপাদন করা হবে। যেহেতু সময় স্বল্প, তাই ‘নাবি’ (দেরিতে রোপণযোগ্য) জাতের ধান চাষে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এ জন্য বিএডিসির (বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন) মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে বিআর-২২ ও বিআর-২৩ জাতের বীজ সরবরাহ করা হচ্ছে। উৎপাদিত চারা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিতরণ করা হবে, যাতে তারা মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই আবার আমন রোপণ নিশ্চিত করতে পারেন।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আর্থিক মূল্যের দিক থেকে এবারের বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মৎস্য খাত। দেশের ৩৩টি জেলার ১২০টি উপজেলার মৎস্যচাষিরা এখন সর্বস্বান্ত। সরকারি হিসাব মতে, আকস্মিক বন্যায় ভেসে গেছে ৩৩ হাজার ৯২০টি পুকুর, দীঘি, মাছের খামার ও ঘের। এর ফলে চাষ করা ১২ হাজার টন ফিনফিশ (রুই, কাতলা, মৃগেল প্রভৃতি) এবং প্রায় দেড় হাজার টন রফতানিযোগ্য চিংড়ি বানের পানিতে ভেসে গেছে। একই সাথে নষ্ট হয়েছে খামারিদের নার্সারিতে থাকা প্রায় ১৮ কোটি ৫৭ লাখ পিস মাছের পোনা। শুধু মাছের ব্যবসাই নয়, উপকূলীয় ও নদী তীরবর্তী এলাকার ৩০টি মাছ ধরার নৌকা বা ট্রলার এবং ২২০টি দামি জাল সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। এ খাতে অবকাঠামোগত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে মৎস্য খাতে প্রাথমিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৬৮ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, যা তিন খাতের মধ্যে এককভাবে সর্বোচ্চ।
প্রাণিসম্পদেও বড় ধাক্কা : খামারিদের হাহাকার
একই মন্ত্রণালয়ের প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, বন্যার পানিতে ডুবে ও বিভিন্ন সংক্রমণে ৪৬টি গরু, ১২৩টি ছাগল, ৪০টি ভেড়া, এক লাখ ১১ হাজার ১৫২টি মুরগি এবং এক হাজার ৫৭৫টি হাঁস মারা গেছে। এ ছাড়া চার হাজার ৫৫৬টি গবাদিপশুর বাণিজ্যিক খামার এবং ছয় হাজার ৬০টি হাঁস-মুরগির খামার (পোলট্রি ফার্ম) খামারিদের চোখের সামনে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। প্রাণিসম্পদ খাতে প্রাথমিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রাক্কলন করা হয়েছে প্রায় ৭৪ কোটি টাকা।
উল্লেখ্য যে, ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার পর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, খামারি ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর টেকসই পুনর্বাসনে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় ২৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় তিন হাজার ৩১৩ কোটি টাকা) ব্যয়ে একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন কর্মসূচি হাতে নিয়েছিল সরকার। তারই অংশ হিসেবে, বর্তমানে প্রায় ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ২৪৪ কোটি টাকা) ব্যয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (ডিএই) ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) যৌথভাবে ‘বি-স্ট্রং’ নামের একটি বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা এবং জলবায়ু-সহনশীল আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
‘বি-স্ট্রং’ প্রকল্পের আওতায় মাঠপর্যায়ে কৃষকদের জন্য বিভিন্ন ফসলের জলবায়ু-সহনশীল প্রদর্শনী স্থাপন, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও চাষাবাদ বিষয়ে নিবিড় প্রশিক্ষণ, উন্নতমানের বীজ ও কৃষি উপকরণ সরবরাহ, আধুনিক কৃষিযন্ত্র বিতরণ এবং উৎপাদন পুনরুদ্ধারে কারিগরি সহায়তা দেয়া হচ্ছে।
অন্য দিকে এই তহবিলের অবশিষ্ট বেশির ভাগ অর্থাৎ প্রায় ২৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে বিভিন্ন টেকসই অবকাঠামো ও দুর্যোগ-সহনশীল উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো), স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি), সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (এসডিএফ) এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর। এই মহাপরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে :
* অববাহিকাভিত্তিক নদী ও প্রধান প্রধান খাল পুনঃখনন; অবরুদ্ধ পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও সংস্কার; বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ রাস্তাঘাট, বাঁধ ও কালভার্ট পুনর্নির্মাণ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবিকা পুনর্বাসন এবং স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ মোকাবেলায় সক্ষমতা বৃদ্ধি।
তবে সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও ভুক্তভোগীদের মতে, এই দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের সুফল মাঠপর্যায়ে পুরোপুরি দৃশ্যমান হওয়ার আগেই, মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ফের একই ধরনের বন্যা আঘাত হানায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি ভয়াবহ ‘ডাবল ব্লো’ বা দ্বিগুণ ধাক্কা লেগেছে। আগের ঋণের বোঝা ও ক্ষতের ওপর নতুন এই ক্ষত গ্রামীণ মানুষের টিকে থাকার লড়াইকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের তাগিদ ও নীতি-নির্ধারণী সঙ্কট
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সাবেক পরিচালক ও বিশিষ্ট কৃষিবিদ আহমেদ আলী চৌধুরী ইকবাল এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘শুধু অতিবৃষ্টিকে দোষ দিলে প্রকৃত সত্য আড়াল করা হবে। আমাদের অপরিকল্পিত উন্নয়ন, প্রাকৃতিকভাবে পানি নেমে যাওয়ার ঐতিহাসিক পথ বা ড্রেনেজ করিডোরগুলো সঙ্কুচিত করা এবং যত্রতত্র ও অবৈধভাবে মাছের ঘের তৈরি করে কৃত্রিম উপায়ে পানি আটকে রাখার কারণেই এবারের বন্যায় কৃষির ক্ষয়ক্ষতি এতটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেছে। পরিকল্পনাহীন গ্রামীণ রাস্তাঘাট ও অপরীক্ষিত অবকাঠামো নির্মাণ আমাদের পুরো প্রাকৃতিক পানি প্রবাহকে অবরুদ্ধ করে ফেলেছে।’
তিনি আরো যোগ করেন, ‘২০২৪ সালের বন্যা ও এবারের বন্যার চরিত্র ও কারণের মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা না করলে আগামী বছরগুলোতেও একই বিপর্যয় দেখতে হবে। তাই রাস্তাঘাট, বাঁধ, স্লুইসগেট, নগরায়ন ও শিল্পায়ন- সব উন্নয়ন কার্যক্রমকে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। একই সাথে খাল-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার, আধুনিক ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং কৃষিজমি সংরক্ষণ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।’
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক এই সঙ্কটের গভীরতা তুলে ধরে বলেন, ‘আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মূল ফোকাস থাকে ‘ত্রাণ ও পুনর্বাসনে’, কিন্তু সঙ্কট রুখতে হলে ফোকাস সরাতে হবে ‘পূর্বপ্রস্তুতি ও স্থায়ী অবকাঠামো সংস্কারে’। বছরের পর বছর ধরে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে, অথচ ড্রেজিং হচ্ছে নামমাত্র। স্লুইসগেটগুলো সচল আছে কি না, তা দেখার কেউ নেই। যখনই বন্যা আসে, আমরা কৃষকদের সার-বীজ দিয়ে ভাবি দায়িত্ব শেষ। কিন্তু বন্যা কেন বারবার একই অঞ্চলে এসে কৃষকের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে, সেই পলিসি লেভেলের ত্রুটি দূর করতে হবে। আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় না বাড়ালে কোনো প্রকল্পই কাজে আসবে না।’
সার্বিক বিষয়ে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ প্রতিবেদনের শেষভাগে আশ্বস্ত করে জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, মৎস্যচাষি ও খামারিদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে পুনর্বাসনে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে। তিনি বলেন, ‘কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ, সার ও প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ বিতরণ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি গবাদিপশুর জন্য জরুরি ভিত্তিতে শুকনা খাদ্য সরবরাহ, মহামারী রোগ প্রতিরোধে টিকাদান এবং মাঠপর্যায়ে জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ভেটেরিনারি টিম কাজ করছে।’
বিশেষজ্ঞদের সম্মিলিত মত হলো- কেবল সাময়িক ত্রাণ বিতরণ বা চারা বিতরণ দিয়ে এই জাতীয় বিপর্যয়ের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে স্বল্প সময়ে অতিভারী বর্ষণের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে অববাহিকাভিত্তিক সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা, জাতীয় নদীর কার্যকর পুনঃখনন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্লুইসগেটগুলোর আধুনিকায়ন এবং স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের তৈরি অপরিকল্পিত বাঁধ ও অবৈধ মাছের ঘের উচ্ছেদে কঠোর রাজনৈতিক আইনি পদক্ষেপ না নিলে, কুমিল্লা-নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের মতো সমৃদ্ধ অঞ্চলকে বারবার এই ধ্বংসযজ্ঞের মুখোমুখি হতে হবে। একই সাথে যদি যুদ্ধকালীন তৎপরতায় আমনের বীজতলা ও আউশের জমি উদ্ধার করা না যায়, তবে আগামী মৌসুমে দেশের সামগ্রিক চাল উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের সাধারণ চালের বাজারে।