রাশিয়ায় যুদ্ধে অংশ নেয়া ৩০ কর্মীর ফেরত আসা অনিশ্চিত!

কোম্পানি মালিক ইগোরসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি : রাষ্ট্রদূত

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

অলৌকিক কোনো ঘটনা না ঘটলে রাশিয়ায় বৈধভাবে পাড়ি জমানোর পর রুশ সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি হওয়া ৩০ বাংলাদেশী শ্রমিকের দেশে ফেরত আসা অনেকটাই অনিশ্চিত বলে মনে করছেন অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা। তার পরও দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে প্রতিনিয়ত কর্মীদের সন্ধান ও উদ্ধারে চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রেখেছেন।

তিনি নিখোঁজ কর্মীদের সর্বশেষ অবস্থান জানার পাশাপাশি যুদ্ধে গিয়ে যারা এরইমধ্যে আহত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন, তাদের সাথে সাক্ষাতেরও চেষ্টা চালাচ্ছেন। কিন্তু রাশিয়ান সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে অনুমতি না পাওয়ায় তিনি সাক্ষাৎ করতে গিয়েও ফিরে এসেছেন। যদিও ড্রোন হামলায় গুরুতর আহত চারজন শ্রমিকের মধ্যে কেউ কেউ রাশিয়ান সেনাবাহিনীর হেফাজতে থেকেই তাদের পরিবারের সাথে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথা বলতে পারছেন।

দু’দিন আগে রাশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নজরুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, আমি মস্কো থেকে দেড় হাজার কিলোমিটার দূরের লুহান্সেক নামক এলাকায় থাকা একজন অসুস্থ বাংলাদেশীর সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু রাশিয়ান সেনাবাহিনী আমাকে তার সাথে সাক্ষাৎ করার অনুমতিই দেয়নি। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আমাকে জানানো হয়েছে, কর্মীরা স্বেচ্ছায় যুদ্ধে এসেছে। এর জন্য তাদেরকে নগদ রুবলসহ সব সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়েছে। এখন তাদের চিকিৎসা চলছে। সুস্থ হলেই তাকে আবার যুদ্ধের ময়দানে পাঠানো হবে। তারা বলেছে, বাংলাদেশীকে ফেরতও দেয়া হবে না, সাক্ষাৎও করানো হবে না।

রাষ্ট্রদূত বলেন, আমি যে বাংলাদেশীর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম তার নাম আদনান। সে আমাকে জানিয়েছে তার চিকিৎসা সেনাহেফাজতে ভালোই হচ্ছে। তবে এখনো সে দাঁড়াতে পারছে না। পেটফুলে গেছে। প্রস্রাব হলুদ হচ্ছে। তখন আমি ওই কর্মীকে বলেছি, তুমি আগে চিকিৎসা নাও। রাজবাড়ীর সোহেল এখন কোথায় আছেÑ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ও তো আছে মস্কো থেকে দেড় হাজার কিলোমিটার দূরের দোনেক্স এলাকায়। সেখানে সে কোথায় আছে সেটি কোনোভাবেই জানা সম্ভব নয়। সেখানে যাওয়ার সুযোগ নাই। অন্য দুই অসুস্থসহ ২৮ জনের কোনো খবর আমরা জানার চেষ্টা করছি। কিন্তু নানাভাবে চেষ্টা করেও জানতে পারছি না। তাহলে তাদের কি দেশে ফেরা অনিশ্চিত? এমন প্রশ্নের উত্তরে রাষ্ট্রদূতি নয়া দিগন্তকে বলেন, আমি সেভাবে বলব না। বলতে পারিও না। তবে যারা রাশিয়ান সরকারের ফর্ম পূরণ করে স্বেচ্ছায় ইউক্রেনের সাথে যুদ্ধে অংশ নিতে রাশিয়ান সেনাবাহিনীর খাতায় নাম লিখিয়েছে, তাদের সেখান থেকে ফিরে আসা একান্ত রুশ সেনাবাহিনীর কমান্ডারদের সিদ্ধান্ত। কমান্ডাররা বলছে, ফেরত দেয়ার প্রশ্নই আসে না। তারা তো এ কর্মীদের কিনে নিয়েছে। তাহলে এসব শ্রমিকরা কি সরকারের কাছ থেকে কোনো ক্ষতিপূরণ পাবে না? তাদের পরিবারগুলো কার সাথে কোথায় যোগাযোগ করবে এমন প্রশ্নের উত্তরে রাষ্ট্রদূত বলেন, এখানেই তো সমস্যা। এটি বলার সময় আসেনি। কারণ কোন কর্মী মারা গেছে, সেটি প্রমাণ করতে হলে ডেথ সার্টিফিকেট লাগবে। এই সার্টিফিকেট কে দেবে? রাশিয়ানরা কোন কর্মী মারা যাওয়ার কথা স্বীকারই করছে না। তারা বলে মিসিং। তার পরও নিখোঁজ থাকা কর্মীদের অবস্থান জানতে আমাদের সরকারের দিক নির্দেশনায় রাশিয়ান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চাপ দিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু তাদের পক্ষ থেকে আমাদেরকে কিছুই জানানো হচ্ছে না। তাই দূতাবাসের পক্ষ থেকে রাশিয়ার যে কোম্পানির নামে বাংলাদেশী কর্মীরা এসেছিল, ওই কোম্পানির মালিক ইগোর ও ওই কোম্পানির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এক মহিলার নাম উল্লেখ করে আমরা পুলিশে রিপোর্ট করার পাশাপাশি রাশিয়ার সিভিল কোর্টে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই বিষয়টি আমি আমার মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছি। আর মামলা করার জন্য দূতাবাসের কাছে কোনো ফান্ড নেই। মন্ত্রণালয় থেকে মামলা করার অর্থ দেয়া হলে আমরা সাথে সাথে মামলা দায়ের করব।

৩০ কর্মী বিক্রির ঘটনার পর রাশিয়র সম্ভবনাময় শ্রমবাজার হুমকিতে রয়েছে কি না জানতে চাইলে রাষ্ট্রদূত নজরুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, এটা তো অবশ্যই খারাপ ঘটনা হয়ে থাকবে। তবে এরইমধ্যে যারা বৈধভাবে এ দেশে এসে কাজ করছে, তারা সবাই চুক্তি মোতাবেক ভালো আছে। এখন সেখান থেকে কেউ যদি প্রলোভনে পড়ে যুদ্ধে চলে যায়, সে ক্ষেত্রে আমাদের কার কী করার থাকে? তবে তিনি ঢাকার প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও বিএমইটিকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, এই দেশে যারা আসতে চাচ্ছে তাদের অন্তত কিছুটা রাশিয়ান ভাষাটা প্রশিক্ষণ দিয়ে তারপর যেন পাঠানো হয়।

এ দিকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচির মো: মোখতার আহমেদের সাথে তার দফতরে সাক্ষাৎ করে কর্মীদের উদ্ধারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা ৩০ কর্মীর বিষয়টি জানার পরই দুই দেশে পৃথক কমিটি গঠন করেছি। আশা করছি, কমিটির প্রতিবেদন আসার পরই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পরব।