পুুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানি আনতে ডিরেক্ট লিস্টিংকে প্রাধান্য দেয়া হবে : বিএসইসি চেয়ারম্যান

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেছেন, দেশের পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়াতে ভালো ও মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি আনার ক্ষেত্রে ডিরেক্ট লিস্টিংকে প্রাধান্য দেয়া হবে। তিনি বলেন, এ জন্য দ্রুততম সময়ে আইন সংশোধন করতে হবে। কারণ বিদ্যমান আইনে শুধুমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোই ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে আসতে পারে। গতকাল পুঁজিাবাজার নিয়ে কাজ করা সাংবাদিকদের সংগঠন ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্ট ফোরাম (সিএমজেএফ) আয়োজিত সিএমজেএফ টক এ তিনি এসব কথা বলেন।

সংগঠনের সভাপতি মনির হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব রাসেল।

বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি বর্তমান পুঁজিবাজারের গভীরতা বৃদ্ধির জন্য খুবই জরুরি। তাই বহুজাতিক বিভিন্ন কোম্পানির পাশাপাশি দেশীয় ভালো কোম্পানিগুলোকেও ডিরেক্ট লিস্টিং পদ্ধতির মাধ্যমে তালিকাভুক্তির সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে তারা কমপক্ষে ১০ শতাংশ শেয়ার ছাড়লেই এ সুযোগ পাবে। তবে যেনতেন কোম্পানি এ সুযোগ পাবে না। এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইপিও রুলসে পরিবর্তন আনতে হবে। আইপিওর মাধ্যমে তালিকাভুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এ মুহূর্তে কোনো কোম্পানিকে আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজারে আসতে গেলে এক বছরের বেশি সময় প্রয়োজন হয়।

পুঁজিবাজারের সংস্কারের লক্ষ্যে বিগত কমিশনের নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগের বিষয়ে তিনি বলেন, মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা এবং মার্জিন রুলস বিধিমালায়ও কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। এ গুলোকে আরো বাজারবান্ধব করতে না পারলে তা কার্যকর সম্ভব হবে না।

মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালার পরিবর্তন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মিউচুয়াল ফান্ডকে কার্যকর করা না গেলে পুঁজিবাজারের ব্যাপ্তি বাধাগ্রস্ত হবে। কারণ সাধারণ বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারের ইনস্ট্রুমেন্ট সম্পর্কে কার্যকর ধারণা রাখেন না। তাই বাজারকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে গেলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। ইতোমধ্যে বে-মেয়াদি ফান্ডের অনুমোদন শুরু হয়েছে। দ্রুততম সময়ে বাজারে আরো বেশি কার্যকর ফান্ড আনা গেলে বাজার গতি ফিরে পাবে।

পুঁজিবাজারের সার্বিক সংস্কারের প্রসঙ্গে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘কারো বানর আমি নিজের ঘাড়ে নেবো না।’ প্রাইমারি রেগুলেটর হিসেবে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জকে (সিএসই) তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। কোম্পানির তালিকাভুক্তি থেকে শুরু করে পুঁজিবাজারের ডে-টু-ডে সব ধরনের কর্মকাণ্ডে তারা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেবে।

চেয়ারম্যান হিসেবে নিজের অবস্থান সম্পর্কে বলতে গিয়ে মাসুদ খান বলেন, বর্তমান কমিশন শুধু রেগুলেটর হিসেবে নয় ফ্যাসিলিটেটর হিসেবে বাজারবান্ধব সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে যাবে।

দ্রুততম সময়ে পুঁজিবাজারের ডিজিটালাইজেশন করা হবে উল্লেখ করে মাসুদ খান বলেন, ম্যানুয়েল সব কর্মকাণ্ড থেকে বেরিয়ে আসতে হবে সব কিছুই ডিজিটাল করে ফেলা ছাড়া এই সময়ে পুঁজিবাজার চলতে পারে না। এরপর আমরা ক্রমান্বয়ে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) পদ্ধতির দিকে এগিয়ে যাবো। তখন বিএসইসি, ডিএসই ও সিএসইর পক্ষে যেকোনো বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত উৎপাদন বন্ধ থাকা কোম্পানি সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, পৃথিবীর কোথাও এ ধরনের কোম্পানি তিন মাসের বেশি তালিকাভুক্ত থাকতে পারে না। কিন্তু আমাদের এখানে বছরের পর বছর তা থাকছে। এটা চলতে দেয়া যায় না।

বাজারের কারসাজি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো কোম্পানির শেয়ার নিয়ে কারসাজি হচ্ছে মনে হলে ডিএসই-সিএসই দ্রুতই ব্যবস্থা নিতে পারবে। এর জন্য বিএসইসির দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না। তাৎক্ষণিকভাবে কোম্পানিটির লেনদেন স্থগিত করা হবে। তা ছাড়া পুঁজিবাজার কারসাজির শাস্তি নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট একটি বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা চেষ্টা করব যেখানে দ্রুততম সময়ে এর বিচার নিশ্চিত করা যায়। বিদ্যমান যে আদালত রয়েছে তার কথা উল্লেখ করে মাসুদ খান বলেন, এটার বলতে গেলে কোনো কাজই নেই। কারণ আইনের নানা ফাঁকফোকর থাকায় এই আদালতের মাধ্যমে খুব একটা সুরাহা হয় না।

এ দিকে গতকাল সাম্প্রতিক সময়ে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ সূচক। এ দিন ডিএসইর প্রধান সূচকটির উন্নতি ঘটে ৩৩ দশমিক ৭৮ পয়েন্ট। পাঁচ হাজার ৭৭০ দশমিক ২৭ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা ডিএসইর প্রধান সূচকটি সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসের লেনদেন শেষে পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ৮০৪ দশমিক ০৬ পয়েন্টে। ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বরের পর ডিএসইর প্রধান সূচকটি আর এ পর্যায়ে পৌঁছেনি। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৮ দশমিক ৫১ ও ২ দশমিক ৪৭ পয়েন্ট।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বুধবার সংসদে প্রধানমন্ত্রী পুঁজিবাজার নিয়ে বেশ কিছু পরিকল্পনা এবং ইতোমধ্যে নেয়া নানা উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন। জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য বিনিয়োগকারীদের কাছে খুবই প্রেরণাদায়ক ছিল। এরই প্রতিফলন ঘটেছে বাজারে। সূচকের উন্নতির পাশাপাশি দেশের দুই পুঁজিবাজারেই এ দিন লেনদেনের যথেষ্ট উন্নতি ঘটে।

ঢাকা স্টকে গতকাল এক হাজার ৪২৮ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয় যা আগের দিন অপেক্ষা ২৭২ কোটি টাকা বেশি। বুধবার ডিএসইর লেনদেন ছিল এক হাজার ১৫৬ কোটি টাকা। অনুরূপভাবে লেনদেন বেড়েছে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারেও। এখানে ৪৮ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয় গতকাল। আগের দিন সিএসইর লেনদেন ছিল ২৬ কোটি টাকা।