স্পেন-বেলজিয়াম
সেমিতে ওঠার লড়াই ইউরোপের পরাশক্তির
Printed Edition
ক্রীড়া প্রতিবেদক
ইউরোপের দুই শক্তিশালী দল স্পেন ও বেলজিয়াম লড়াই। ফিফা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে এই দুই দল। ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের কারণে অনেকেই শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে দেখছেন স্পেনকে। অন্য দিকে টুর্নামেন্ট যত এগিয়েছে, ততই নিজেদের ছন্দ ফিরে পেয়েছে বেলজিয়াম। ফলে ম্যাচটি কেবল দুই দলের লড়াই নয়, বরং দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনেরও সংঘর্ষ। তাই ফুটবলপ্রেমীদের জন্য অপেক্ষা করছে জমজমাট লড়াই। বাংলাদেশ সময় আজ রাত ১টায় যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে ম্যাচটি।
বিশ্বকাপের চলমান আসরে এখন পর্যন্ত দুর্দান্ত ফর্মে স্পেনের রক্ষণভাগ। কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে দলটি বেশ ভারসাম্যপূর্ণ। এখনো পর্যন্ত কোনো গোল হজম করেনি তারা। টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্ব থেকে শুরু করে নকআউট পর্বের শেষ ষোলো পর্যন্ত খেলা পাঁচটি ম্যাচের প্রতিটিতেই নিজেদের জাল অক্ষত রাখতে সক্ষম হয়েছে। কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেয়া দলগুলোর মধ্যে এই অনন্য কীর্তি অর্জন করেছে একমাত্র স্পেনই। দলটির আক্রমণভাগে বিশেষ করে উইং আক্রমণ প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি লামিন ইয়ামাল ও বায়েনা।
উয়েফা নেশন্স লিগে গত আসরের ফাইনালে পর্তুগাল কাছে হেরেছিল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন স্পেন। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় ২-২ গোলে ড্র’র পর টাইব্রেকারে স্পেনকে ৫-৩ গোলে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল পর্তুগাল। নেশন্স লিগের ফাইনালে আইবেরীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে পরাজিত হলেও মিকেল মেরিনোর শেষ মুহূর্তের গোলে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোদের হারিয়ে শেষ আট নিশ্চিত করে লা রোজারা। সেমিতে উঠার পথে এবার তাদের সামনে বড় বাধা বেলজিয়াম।
বর্তমান ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নরা এখন পর্যন্ত ছয়টি প্রধান নকআউট ম্যাচ থেকেই পরবর্তী পর্বে উত্তীর্ণ হয়েছে। এতে ইঙ্গিত দেয় তাদের থামানো খুব কঠিন হতে পারে। এবারের বিশ্বকাপে শুরু থেকেই দারুণ ছন্দেও রয়েছে স্পেন। কোচ দে লা ফুয়েন্তের অধীনে দলটি সংগঠিত, কৌশলগতভাবে পরিণত এবং আত্মবিশ্বাসী। বলের দখল ধরে রেখে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার যে ঐতিহ্য স্পেনের, সেটির সাথে এখন যোগ হয়েছে দ্রুত ট্রানজিশন ও আরো কার্যকর আক্রমণ। শেষ ষোলোতে পর্তুগালের বিপক্ষে ১-০ গোলের কঠিন জয় তাদের মানসিক দৃঢ়তারই প্রমাণ। শেষ মুহূর্তে গোল করে ম্যাচ জেতার ক্ষমতা দেখিয়েছে যে এই দল শেষ পর্যন্ত লড়াই করতে জানে।
স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের মিডফিল্ড। রদ্রি, পেদ্রি ও দানি ওলমো কিংবা ফাবিয়ান রুইস- যেই খেলুক না কেন, মাঝমাঠে তাদের নিয়ন্ত্রণই ম্যাচের গতি নির্ধারণ করে। মিকেল ওয়ারজাবালের অভিজ্ঞতা ও সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতা বড় ভরসা স্পেনের। দলটি কেবল এক-দু’জন তারকার ওপর নির্ভরশীল নয়; পুরো স্কোয়াডই সমানভাবে অবদান রাখতে সক্ষম।
অন্যদিকে কিছুটা ওঠানামার মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপে যাত্রা শুরু হয়েছিল বেলজিয়ামের। গ্রুপ পর্বে তারা প্রত্যাশামতো শুরু করতে পারেনি, তবে নকআউট পর্বে এসে সেরা ফুটবল খেলছে রেড ডেভিলসরা। দলের আত্মবিশ্বাস অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে শেষ ষোলোতে আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে বড় জয়ে। অভিজ্ঞ ও তরুণ ফুটবলারদের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে পেরেছেন কোচ রুডি গার্সিয়া। ফলে আগের চেয়ে অনেক বেশি সংগঠিত ও আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলছে এখন বেলজিয়াম।
বেলজিয়ামের সবচেয়ে বড় ভরসা গোলরক্ষক থিবো কর্তোয়া। বড় ম্যাচে অসাধারণ সব সেভ করার অভিজ্ঞতা তার রয়েছে। মাঝমাঠে ইউরি টিলেমান্স, আক্রমণে চার্লস ডি কেটেলারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। কেভিন ডি ব্রুইনাকে শুরুর একাদশে দেখা যাবে কি না- সেটিও বড় আলোচনার বিষয়। শুরুর একাদশে না থাকলেও বেঞ্চ থেকে নেমে কার্যকর ভূমিকা রেখে চলেছেন রোমেলু লুকাকু। তবে দলের জন্য বড় ধাক্কা হলো মিডফিল্ডার আমাদু ওনানার চোট। স্পেনের শক্তিশালী মিডফিল্ডের বিপক্ষে তার অনুপস্থিতি ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে বেলজিয়ামের।
ইতোমধ্যেই ব্যাপক সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ফরাসি কোচ রুডি গার্সিয়া শেষ ষোলোর ম্যাচে কেভিন ডি ব্রুইনা, জেরেমি ডোকু এবং সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা রোমেলু লুকাকুকে বেঞ্চে বসিয়ে রেখে একটি ঝুঁকি নিয়েছিলেন। এতে সফলতাও পেয়েছেন এই কোচ। আসরের সহ-আয়োজকদের বিপক্ষে ৪-১ গোলের এক চমকপ্রদ জয়ে কোয়ার্টারে জায়গা করে নেয় বেলজিয়াম।
এই ম্যাচের অন্যতম আকর্ষণ হবে মাঝমাঠের লড়াই। স্পেন যদি রদ্রি ও পেদ্রির মাধ্যমে বলের দখল ধরে রাখতে পারে, তাহলে বেলজিয়ামকে দীর্ঘ সময় রক্ষণ সামলাতে হবে। অন্য দিকে বেলজিয়াম চেষ্টা করবে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে স্পেনের ডিফেন্সের ফাঁক খুঁজে বের করা। ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে কর্তোয়ার দীর্ঘ পাস কিংবা ডি কেটেলারের মুভমেন্ট।
ফুটবলে ২২ বার স্পেনের মুখোমুখি হয়েছে বেলজিয়াম। এর মধ্যে ১২টি ম্যাচে জয়ী হয়েছে স্পেন। পাঁচটি ম্যাচ জিতেছে বেলজিয়াম। অন্য পাঁচটি ম্যাচ ড্র হয়েছে। বিশ্বকাপের মঞ্চে দুই দল এর আগে মাত্র দুইবার মুখোমুখি হয়েছে। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে স্পেন ও বেলজিয়ামের মধ্যকার কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র থাকার পর টাইব্রেকারে ৫-৪ ব্যবধানে জিতেছিল বেলজিয়াম। পরবর্তীতে ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে বেলজিয়ামকে ২-১ গোলে হারিয়ে মধুর প্রতিশোধ নিয়েছিল স্পেন। সর্বশেষ প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে স্পেন ৫-০ গোলে বিধ্বস্ত করেছিল বেলজিয়ামকে। এরপর দীর্ঘ ১৬ বছরেরও বেশি সময় পর এবার ফিফা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে এই দুই ইউরোপীয় পরাশক্তি লড়াই দেখবে ফুটবল বিশ্ব।
১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিল স্পেন। ২২ জুন অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচটিতে নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের খেলা ১-১ সমতায় শেষ হওয়ার পর টাইব্রেকারে ৫-৪ গোলে স্পেনকে পরাজিত করে সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছিল বেলজিয়াম। ৪০ বছর পর আবার বিশ্বকাপের শেষ আটের লড়াইয়ে মুখোমুখি দুই দল। এবার কি পারবে ১৯৮৬ সালের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে বেলজিয়াম, নাকি সেই আসরে পরাজয়ের প্রতিশোধ নেবে স্পেন।