চার কোম্পানির দখলে ডিএসইর লেনদেনের ১৭ শতাংশ

হারানো দর ফিরে পাচ্ছে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

মাঝখানে একটি সপ্তাহ খারাপভাবে পার করলেও দেশের পুঁজিবাজার আবারো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শুরু করেছে। গত সপ্তাহে দেশের দুই পুঁজিবাজারেই সূচকের উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটতে দেখা যায়। এবার বাজার আচরণের প্রধান বিশেষত্ব ছিল ব্যাংকসহ অন্য খাতের মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলো কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে পুঁজিবাজারের লেনদেন। এরই অংশ হিসেবে বিদায়ী সপ্তাহে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মোট লেনদেনের ১৭ শতাংশই দখলে ছিল চারটি কোম্পানির। এদের মধ্যে দু’টি ব্যাংকিং খাতের কোম্পানির দখলেই ছিল ১০ শতাংশের বেশি। এর বাইরে অন্য দু’টি খাতের দুই কোম্পানির দখলে ছিল ৭ শতাংশের বেশি।

গত সপ্তাহে (২২-২৬ ফেব্রুয়ারি) মোট পাঁচটি কার্যদিবেসর মধ্যে দু’টিতে সূচকের বড় ধরনের উন্নতি আগের সপ্তাহের হারানো সূচকের পুরোটাই ফিরে পেতে সাহায্য করে। সপ্তাহান্তে ডিএসই সূচকটি এক সপ্তাহ আগের ৫ হাজার ৬০০ পয়েন্টের ঘরে পৌঁছে যায়। আর সূচকের এ উন্নতিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকাটি ছিল ব্যাংকিং খাতের পাশাপাশি অন্যান্য খাতের বেশ কিছু মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির। দীর্ঘদিন ধরে যে সব কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কাড়তে ব্যর্থ হয়েছিল সেসব কোম্পানির দিকেই বিনিয়োগকারীর ফিরে আসা শুরু হয়েছে। আর এতে পুঁজিবাজার ফিরে পেতে শুরু করেছে তার স্বাভাবিক গতি। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর সব পর্যায়ের বিনিয়োগকারিদের আস্থা অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা ধরে রাখা গেলে খুব দ্রুতই পুঁজিবাজার আবার স্বাভাবিকতা ফিরে পাবে।

ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গত সপ্তাহে ১৩৪ দশমিক ৩৪ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। গত রোববার ৫ হাজার ৪৬৫ দশমিক ৯৩ পয়েন্ট থেকে সপ্তাহ শুরু করা সূচকটি গত বৃহস্পতিবার দিনশেষে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৬০০ দশমিক ২৭ পয়েন্টে। আগের সপ্তাহের ধারাবাহিক পতনের রেশ ধরে সপ্তাহের প্রথম দিনে বাজার কিছুটা নেতিবাচক আচরণে থাকলেও বাকি দিনগুলোতে তা কাটিয়ে ওঠে। এর মধ্যে দু’দিন সূচকের বড় ধরনের উন্নতি রেকর্ড করা হয়। একই সময় ডিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ’র উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৭১ দশমিক ৫৮ ও ২১ দশমিক ০৯ পয়েন্ট। সূচকের এ উন্নতিতে ব্যাংকিং খােিতর কয়েকটি কোম্পানির পাশাপাশি বড় ভূমিকা ছিল অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রি ও টেলিযোগাযোগ খাতের বহুজাতিক কোম্পানি রবি অজিয়াটার। কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কাড়তে ব্যর্থ হলেও সম্প্রতি এ দিকে তাদের ঝোঁক বেড়েছে।

এ ছাড়া সূচকের এ উন্নতি বিদায়ী সপ্তাহটিতে ডিএসইর বাজার মূলধনে যোগ করে বড় অঙ্ক। গত সপ্তাহে ডিএসইর বাজার মূলধনে যুক্ত হয়েছে ৮ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা। রোববার ৭ লাখ ১০ হাজার ৩৭ কোটি টাকা মূলধন নিয়ে শুরু করা পুঁজিবাজারটির মূলধন সপ্তাহান্তে পৌঁছে যায় ৭ লাখ ১৮ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকায়।

সূচক ও বাজার মূলধনে বড় ধরনের উন্নতি ঘটলেও গত সপ্তাহে ডিএসইর লেনদেনে অবনতি ছিল চোখে পড়ার মতো। এ সময় ডিএসইর লেনদেন কমেছে ৩০ দশমিক ৯৭ শতাংশ। গত সপ্তাহে ডিএসইর মোট লেনদেন ছিল ৩ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা, যা আগের সপ্তাহ অপেক্ষা ৩০ দশমিক ৯৭ শতাংশ কম। আগের সপ্তাহে বাজারটির মোট লেনদেন ছিল ৫ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন এর আগের সপ্তাহে সূচকের বড় ধরনের উন্নতির পরপরই বাজার ধারাবাহিক সংশোধনের শিকার হয়েছিল। তাই বিনিয়োগকারীরা এবার লেনদেনে বেশ সতর্ক ছিলেন। তা ছাড়া রমজান উপলক্ষে ডিএসইর লেনদেনও আধঘণ্টার বেশি হ্রাস পেয়েছে। এ দু’টি কারণেই গত সপ্তাহে ডিএসইর লেনদেনে বড় অবনতি ঘটে।

সপ্তাহের বাজার আচরণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত সপ্তাহে দীর্ঘদিনের একপেশে বাজার আচরণ থেকে কিছুটা ভারসাম্যপূর্ণ আচরণের দিকে ফিরতে শুরু করেছে পুঁজিবাজার। গত বছরের প্রায় পুরোটা সময় জুড়েই কয়েকটি স্বল্প মূলধনী ও মৌলভিত্তির দিক থেকে দুর্বল কোম্পানিকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছিল পুঁজিবাজার। এখন সে তালিকায় উঠে আসছে স্কয়ার ফার্মা, অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ ও রবি অজিয়াটার মতো কোম্পানিগুলো। তাছাড়া প্রায় প্রতিদিনই ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় জায়গা করে নিচ্ছে ব্যাংকিং খাতের ভালো কোম্পানিগুলো। পুরো বিষয়টি সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে বড় ধরনের ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।

এ দিকে কিছুদিন আগে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ৯টি ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে বন্ধ ঘোষণার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়ার পর থেকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আটটি কোম্পানি টানা দরপতনের শিকার হলেও সম্প্রতি কোম্পানিগুলো আবার হারানো দর ফিরে পেতে শুরু করেছে। গত সপ্তাহে এ সব কোম্পানির বেশ কয়েকটি ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ দশে জায়গা করে নেয়। এর আগে পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংককে একীভূত করার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর মূলধন শূন্য ঘোষণার ফলে বিনিয়োগকারীরা যে পরিমাণ লোকসানের মুখে আছেন সেখানে এসব প্রতিষ্ঠান হারানো দর ফিরে পাওয়ায় বড় লোকসান থেকে তারা বেঁচে যাবেন এমনটিই প্রত্যাশা বিনিয়োগকারীদের। গত ক’দিন আগেও এসব কোম্পানির বেশির ভাগ অভিহিত মূল্যের নিচে লেনদেন হচ্ছিল। গত সপ্তাহে এগুলোর দর পৌঁছে গেছে কিছুটা স্বস্তিদায়ক অবস্থানে।

গত সপ্তাহে ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল ব্যাংকিং খাতের সিটি ব্যাংক। বিদায়ী সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে কোম্পানিটির ৪৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকায় শেয়ার হাতবদল হয়েছে যা ছিল ডিএসইর মোট লেনদেনের ৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ। গড়ে প্রতিদিন ৩১ কোটি ১৫ লাখ টাকার শেয়ার বোচকেনা করে খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ উঠে আসে দ্বিতীয় অবস্থানে। প্রতিদিন গড়ে ২৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা তথা মোট লেনদেনের ৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ দখলে রাখা ব্র্যাক ব্যাংক ছিল তৃতীয় অবস্থানে। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে রবি অজিয়াটা, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, ওরিয়ন ইনফিউশন; সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, ইস্টার্ন ব্যাংক ও যমুনা ব্যাংক।