কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে পলক

‘মাননীয় আদালত, আমি নিজে সাক্ষীকে জেরা করতে চাই’

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

‘মাননীয় আদালত, আমি নিজে সাক্ষীকে জেরা করার অনুমতি চাই। আমরা ন্যায়বিচারের স্বার্থে সহায়তা করতে চাই, আইনি সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের প্রধান আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো মারা গেছেন; তাকে হারিয়ে আমরা এখন নাবিকবিহীন নৌকার মতো চলছি। এ জন্য কিছু অধিকার দিলে মামলায় আমিও নিজে কাজ করতে চাই।’

গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর এজলাসকক্ষে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ট্রাইব্যুনালের উদ্দেশ্যে এই বিশেষ প্রার্থনা জানান সাবেক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় আদালতে উপস্থিত সপ্তম সাক্ষী কবির হোসেন মৃধাকে নিজেই জেরা করার অনুমতি চেয়ে তিনি এই আকুতি জানান। তবে আইনি সুনির্দিষ্ট বিধি অনুযায়ী এই সুযোগ নেই জানিয়ে প্রসিকিউশন পক্ষ পলকের এই আবেদনে তীব্র আপত্তি জানায়।

বিচারপতি মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে গতকাল বৃহস্পতিবার এই মামলার অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে সপ্তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী দেয়া কবির হোসেন মৃধার জেরার নির্ধারিত দিন ছিল। মামলার অপর অভিযুক্ত সজীব ওয়াজেদ জয় বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। শুনানির শুরুতে পলকের আইনজীবী লিটন আহমেদ ট্রাইব্যুনালের কাছে কিছু সময় চেয়ে আবেদন করেন। তিনি আদালতকে বলেন, ‘আমাদের প্রধান আইনজীবী আমিনুল গণি টিটোর আকস্মিক মৃত্যুর পর সিনিয়র আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরীকে এই মামলায় নতুন করে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিগত অনিবার্য কারণে তিনি আজ আদালতে উপস্থিত হতে পারেননি। এজন্য আমরা সময়ের প্রার্থনা করছি।’ তবে ট্রাইব্যুনাল এই সময়ের আবেদনটি মঞ্জুর না করে কার্য তালিকায় থাকা অন্য একটি মামলার কার্যক্রম শেষে দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে জয়-পলকের এই মামলার জেরার কাজ শুরু করার নির্দেশ দেন।

জেরার কাজ শুরু হলে জুনাইদ আহমেদ পলককে ট্রাইব্যুনালের এজলাসকক্ষে থাকা আসামির কাঠগড়ায় তোলা হয়। কাঠগড়ায় উঠেই তিনি সরাসরি ট্রাইব্যুনালের উদ্দেশ্যে নিজেই জেরা করার অনুমতি চান। এ পর্যায়ে পলকের আইনজীবী লিটন আহমেদও আদালতের কাছে আরজি জানান যে, তার মক্কেল নিজেই ১৫ মিনিট জেরা করতে চান। কিন্তু এর তীব্র বিরোধিতা করে প্রসিকিউটর আবদুস সাত্তার পালোয়ান বলেন, ‘আইনে অভিযুক্তের নিজের জেরা করার এমন কোনো সুযোগ নেই। ট্রাইব্যুনালের সুনির্দিষ্ট বিধি অনুযায়ী শুধু অভিযুক্তের নিযুক্ত আইনজীবীই সাক্ষীকে জেরা করতে পারেন।’ জবাবে আইনজীবী লিটন আহমেদ যুক্তি দেখান, পলক নিজেও একজন পেশাদার আইনজীবী এবং তিনি আইন সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখেন। এরপরও ট্রাইব্যুনালের অনুমতি না মেলায় আইনজীবী লিটন আহমেদ নিজেই সাক্ষী কবির হোসেন মৃধাকে জেরা করা শুরু করেন।

জেরা চলাকালে এক আবেগঘন ও নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আইনজীবীর প্রশ্নের জবাবে সাক্ষী কবির হোসেন মৃধা বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর আমি কোনো বিজয় মিছিলে অংশ নেইনি। ওই দিন রাতে আমি উত্তরার হাসপাতালে পৌঁছে আমার ছেলেসহ আরো আটজনের রক্তাক্ত লাশ দেখতে পাই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাকে একটি মৃত্যুসংক্রান্ত কাগজ দিয়েছিল।’

এ সময় সাক্ষীর উদ্দেশ্যে আইনজীবী লিটন আহমেদ একটি সুনির্দিষ্ট মন্তব্য করে বলেন, ‘বিজয় মিছিলে অতিরিক্ত আনন্দ প্রকাশের কারণে সেখানে গোলাগুলি হয় এবং সেই গুলিতেই আপনার ছেলে মারা গেছেন।’ প্রশ্নটি পুরোপুরি অনুধাবন করতে না পেরে বিপর্যস্ত সাক্ষী প্রথমে ‘হ্যাঁ’ সূচক জবাব দেন। এ সময় প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে সাক্ষীকে প্রশ্নটি আবার ভালো করে বুঝিয়ে জিজ্ঞেস করার অনুরোধ করা হলে কাঠগড়া থেকে তীব্র আপত্তি জানান পলক। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রসিকিউশন নিজে সাক্ষ্য দিলে কীভাবে সম্ভব!’ এরপর সাক্ষী কবির হোসেন নিজেকে সামলে নিয়ে প্রকৃত সত্য প্রকাশ করে বলেন, ‘৫ আগস্ট আমার ছেলে পুলিশ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের গুলিতেই শহীদ হয়েছে।’

সাক্ষীর এই জবাবের পর আইনজীবী লিটন আহমেদ জেরার কার্যক্রম সাময়িকভাবে অসম্পূর্ণ বা অসমাপ্ত রাখেন। ঠিক তখনই জুনাইদ আহমেদ পলক ফের ট্রাইব্যুনালের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘মাননীয় আদালত, আমি বিনয়ের সাথে অনুরোধ করতে চাই, আমি সর্বশেষ সংশোধিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ‘বি’ থেকে ‘ই’ পর্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খ পড়েছি। এখানে অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেই নিজের মামলা পরিচালনা করতে পারেন। তাই আমাদের আইনি অধিকার দেয়া হোক এবং প্রিভিলেজ কমিউনিকেশনের (আইনজীবীর সাথে একান্তে পরামর্শ) জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা করা হোক।’ পলকের এই বক্তব্যের পর তার আইনজীবী লিটন আহমেদ ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় তার মক্কেলের সাথে একান্তে কথা বলার জন্য একটি মৌখিক আবেদন জানান। ট্রাইব্যুনাল সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আইনজীবীকে পলকের সাথে কথা বলার জন্য আধা ঘণ্টা সময় বরাদ্দ দেন।

এর আগে গত ১৫ জুন ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে প্রথম জবানবন্দী দিয়েছিলেন উত্তরার বিএনএস এলাকায় ৫ আগস্টের বিজয় মিছিলে অংশ নিয়ে শহীদ হওয়া সানজিদ হোসেন মৃধার বাবা কবির হোসেন মৃধা। আজ তার জেরা অসমাপ্ত থাকায় আগামী কার্যদিবসে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া অনুষ্ঠিত হবে। আজ শুনানিতে প্রসিকিউশনের পক্ষে নেতৃত্ব দেন প্রসিকিউটর আব্দুস সাত্তার পালোয়ান, তার সাথে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর মার্জিনা রায়হান ও মামুনুর রশিদসহ প্রসিকিউশনের অন্য কর্মকর্তারা।