দেশজুড়ে ছাত্র ব্লকেড, অনির্দিষ্টকাল ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ডাক

ফিরে দেখা জুলাই’২৪

হারুন ইসলাম
Printed Edition

কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন পরবর্তীতে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এক অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। যা ছিল ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখা ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের অব্যাহত হত্যা, গুম, খুন ও লুটপাটের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ।

সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথার বিরুদ্ধে ২৪-এর এ দিনে (৫ জুলাই) দেশজুড়ে তীব্র ছাত্র বিক্ষোভ, অবস্থান কর্মসূচি ও সড়ক অবরোধ পালন করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে চার দফা দাবি তুলে ধরেন এবং দাবি আদায় না হলে ৭ জুলাই থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের ডাক দেন।

আদালতের রায়ের পর ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের পরিপত্র পুনর্বিবেচনার উদ্যোগে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা মেধাভিত্তিক নিয়োগের দাবিতে আন্দোলন জোরদার করেন। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ছিল, মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনের প্রতিশ্রুতি থেকে রাষ্ট্র সরে আসছে। এ ক্ষোভের জেরে ৫ জুলাই রাজধানী ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, সাভার, দিনাজপুর, টাঙ্গাইল, যশোর, রাজশাহী, সিলেট, গোপালগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে জনসংযোগ ও রাজপথ অবরোধ কর্মসূচি পরিচালনা করেন। অনলাইন ও অফলাইন-দুই মাধ্যমেই এ দিন আন্দোলনের তীব্রতা ছিল চোখে পড়ার মতো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থীরা চার দফা দাবির পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালান এবং সাধারণ মানুষের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেন।

ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামে শিক্ষার্থীরা প্রথমে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে সমবেত হয়ে পরে বিকেল চারটার দিকে গুরুত্বপূর্ণ ষোলশহর সড়ক অবরোধ করলে যান চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে। সেখানে শিক্ষার্থীরা মেধাভিত্তিক মূল্যায়নের দাবিতে লাগাতার স্লোগান দিতে থাকেন। অন্য দিকে, উত্তরের জেলা দিনাজপুরে বৃষ্টির তোয়াক্কা না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে এবং টাঙ্গাইলে ক্যাম্পাসের প্রবেশপথে মানববন্ধন করেন আন্দোলনকারীরা। সাভারে বিকেলে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক এবং খুলনার শিরোমণি এলাকায় সড়ক অবরোধের কারণে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। গোপালগঞ্জেও শিক্ষার্থীরা টানা তৃতীয় দিনের মতো কর্মসূচি পালন করেন। আন্দোলনকারীদের অভিমত ছিল, সাময়িক এ ভোগান্তি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ন্যায়সঙ্গত রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার লড়াইয়ের অংশ।

এ দিন মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অমর একুশে হলে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ককে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা চাপ প্রয়োগ করে কক্ষ থেকে বের করে দেয়ার চেষ্টা করলে ক্যাম্পাস উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন হল থেকে কয়েকশ সাধারণ শিক্ষার্থী অমর একুশে হলের সামনে এসে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। তারা স্পষ্ট বার্তা দেন যে, আন্দোলনের নেতৃত্বকে ভয় দেখিয়ে দমানো যাবে না। পরে হল প্রশাসনের হস্তক্ষেপে এবং প্রভোস্টের আশ্বাসে মধ্যরাতেই পরিস্থিতি শান্ত হয় এবং শিক্ষার্থীরা তাদের নেতৃত্বকে সসম্মানে কক্ষে ফিরিয়ে নেন। এই ঘটনাটি আন্দোলনকারীদের মধ্যে অভূতপূর্ব ছাত্র ঐক্যের জন্ম দেয়।

শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একাংশ, বিশেষ করে ‘সাদা দল’ আনুষ্ঠানিক সমর্থন প্রকাশ করায় মাঠের আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। একই সময়ে বিতর্কিত সর্বজনীন পেনশন স্কিমের বিরোধিতায় দেশের ৩৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সর্বাত্মক কর্মবিরতি চলায় ক্যাম্পাসগুলোতে এক অভূতপূর্ব স্থবিরতা তৈরি হয়। এ দিকে, ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন সমাবেশ করে শিক্ষার্থীদের এ স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন দমনে প্রশাসনের ভয়ভীতি ও চাপ প্রয়োগের কৌশলের তীব্র সমালোচনা করে এবং শিক্ষার্থীদের ন্যায়সঙ্গত দাবির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানায়।

৫ জুলাইয়ের এ দেশব্যাপী ছাত্র সমন্বয় ও রাজপথের প্রতিরোধ কেবল কোটা সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ক্রমান্বয়ে রাষ্ট্রীয় সমতা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার এক বৃহত্তর সামাজিক সংলাপে পরিণত হতে শুরু করে। দিন শেষে বিভিন্ন শহরের মিছিল ছত্রভঙ্গ হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরবর্তী কর্মসূচির জোর প্রস্তুতি চলতে থাকে। ৭ জুলাই থেকে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের প্রতীকী ও কঠোর সিদ্ধান্তটি ছিল প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে নিজেদের অধিকার আদায়ের এক অদম্য স্পৃহা, যা সামগ্রিক আন্দোলনের গতিপথ নির্ধারণে একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।