শেষ ষোলোর মহারণে ইংল্যান্ড-মেক্সিকো

Printed Edition

ক্রীড়া প্রতিবেদক

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২,২০০ মিটার উঁচুতে এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়াম। এই মাঠেই বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে মুখোমুখি হচ্ছে স্বাগতিক মেক্সিকো ও ইংল্যান্ড। উচ্চতার দিক থেকে মাউন্ট এভারেস্ট আরোহণ করার মতো অবস্থা থ্রি লায়ন্সরা। নকআউট পর্বে ডিআর কঙ্গোকে ২-১ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলোতে জায়গা করে নিয়েছে টমাস টুখেলের শিষ্যরা। অন্য দিকে দুর্বল ইকুয়েডরকে ২-০ গোলে হারানোর মাধ্যমে সহ-আয়োজকদের অনবদ্য জয়যাত্রা অব্যাহত রয়েছে। শেষ ষোলোর অন্যতম আকর্ষণীয় লড়াই হতে যাচ্ছে এ ম্যাচটি। ফুটবল ইতিহাস, বর্তমান ফর্ম, কৌশল ও স্বাগতিক সমর্থকদের উন্মাদনা- সব মিলে এটি হবে নকআউট পর্বের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচগুলোর একটি। কোয়ার্টারে ওঠার লড়াইটি শুরু হবে বাংলাদেশ সময় কাল সকাল ৬টায়।

বিশ্বকাপের অন্যতম শিরোপাপ্রত্যাশী দল হিসেবে টুর্নামেন্টে এসেছে ইংল্যান্ড। গ্রুপ পর্বে শক্তিশালী পারফরম্যান্সের পর শেষ ৩২-এ তারা ডিআর কঙ্গোকে হ্যারি কেনের শেষের দুই গোলে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করে। যদিও সেই ম্যাচে কিছুটা চাপের মুখে পড়েছিল টমাস টুখেলের দল। তবে অধিনায়ক কেনের নৈপুণ্যে শেষ রক্ষা থ্রি লায়ন্সদের। এই বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন কেন। প্রতিপক্ষের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি বায়ার্ন মিউনিখের এই ফরোয়ার্ড।

অন্য দিকে ২৩তম বিশ্বকাপ আসরের বড় চমক বলা যায় মেক্সিকোকে। স্বাগতিকদের সমর্থনে উজ্জীবিত দলটি এখন পর্যন্ত চারটি ম্যাচ জিতে একটিও গোল হজম করেনি। শেষ ৩২-এ তারা ইকুয়েডরকে ২-০ গোলে হারিয়ে দীর্ঘদিনের নকআউট জয়ের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছে। কোচ হাভিয়ের আগুইয়েরের অধীনে দলটি রক্ষণে যেমন সংগঠিত, তেমনি দ্রুত পাল্টা আক্রমণেও ভয়ঙ্কর।

এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় আজতেকা স্টেডিয়ামের পরিবেশ ও মেক্সিকো সিটির উচ্চতা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,২০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত এই ভেনুতে খেলতে অভ্যস্ত নয় ইংল্যান্ডের ফুটবলাররা। পাতলা বাতাসে দৌড়ানোর সক্ষমতা কমে যেতে পারে; যা ম্যাচের শেষভাগে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। টুখেল নিজেও স্বীকার করেছেন, এত অল্প সময়ে এই উচ্চতার সাথে পুরোপুরি মানিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। অন্য দিকে দীর্ঘদিন ধরেই এই পরিবেশে অনুশীলন করে আসছে মেক্সিকো, যা তাদের বড় সুবিধা জোগাবে এই ম্যাচে।

উত্তর আমেরিকায় এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে চলেছে ইংল্যান্ড। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে সেই হারের পর এই প্রথম তারা উঁচু মাঠের আজতেকা স্টেডিয়ামে ফিরছে। চারবারের বিশ্বকাপজয়ী জার্মানিকে হারানো এক জিনিস, কিন্তু মেক্সিকো সিটিতে মেক্সিকোকে হারানো ইকুয়েডরের জন্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ব্যাপার। মঙ্গলবার সহ-আয়োজকদের ২-০ গোলের সহজ জয়ে তারা ‘এল ট্রি’-র অ্যাজতেকা দলের সর্বশেষ শিকারে পরিণত হয়।

ম্যাচে জুলিয়ান কুইনোনস প্রথম গোলটি করেন এবং এরপর রাউল হিমেনেজকে দিয়ে গোল করিয়ে হাভিয়ের আগুইরের দলকে ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যান। চার দশক ধরে তাড়া করে বেড়ানো ভূত তাড়ানোর পর, মেক্সিকোর এই যোগ্য জয় বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে তাদের টানা আট ম্যাচের হারের ধারা ভেঙে দেয়। এর মাধ্যমে তারা ১৯৮৬ সালের আসরের পর প্রথমবারের মতো গ্রুপ-পরবর্তী কোনো ম্যাচে জয় পেল।

অ্যাজতেকা ফ্যাক্টরকেও উপেক্ষা করা অসম্ভব। কারণ মেক্সিকো এই ভেনুতে বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচেই হারেনি। ১০টি ম্যাচের মধ্যে আটটিতে জয় ও দুটিতে ড্র করেছে। ২০১৩ সালে হন্ডুরাসের কাছে হারের পর থেকে এই মাঠে প্রতিযোগিতামূলক ও অপ্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ মিলিয়ে তাদের অপরাজিত থাকার ধারা ২৬-এ দাঁড়িয়েছে। তবে মেক্সিকো এবং ইংল্যান্ডের মধ্যে শেষ চারটি মুখোমুখি লড়াইয়ের প্রতিটিতেই জিতেছে থ্রি লায়ন্সরা। যদিও ২০১০ সালের পর থেকে এই দুই কোয়ার্টার ফাইনাল প্রত্যাশী দল আর মুখোমুখি হয়নি।

বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ইংল্যান্ডকে বেশ কয়েকবারই চোটের শঙ্কায় ভুগতে হয়েছে। সর্বশেষ ঘটনাটি হলো ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচের শেষের দিকে চোটের কারণে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন ডেকলান রাইস। টুখেলের সবচেয়ে বড় দল নির্বাচন সংক্রান্ত দ্বিধা উইংয়েই, যেখানে বিশেষ করে বুকায়ো সাকা এবং অ্যান্থনি গর্ডন- যিনি বদলি হিসেবে নেমে বিশ্বকাপে একাধিক গোলে অবদান রাখা প্রথম ইংল্যান্ড খেলোয়াড়।

অন্য দিকে ইকুয়েডরের বিপক্ষে শেষ ৩২-এর জয়ের পর মেক্সিকো কোনো ফিটনেস উদ্বেগ ছাড়াই মাঠে নামেছে। বিশ্বকাপে তার ঐতিহাসিক প্রথম ম্যাচে কোনো ইনজুরি ছাড়াই মাঠ ছেড়েছেন ১৭ বছর বয়সী প্লেমেকার গিলবার্তো মোরা। তিহুয়ানার এই বিস্ময়বালক বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচের প্রথম একাদশে জায়গা করে নেয়া দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়। ১৯৫৮ সালের পেলের চেয়ে মাত্র ২০ দিনের বড়। মোরাকে নিয়েই খেলা চালিয়ে যাবেন নাকি নাকি আরো অভিজ্ঞ ব্রায়ান গুতিয়েরেজের ওপর ভরসা করবেন কোচ আগুইয়েরে সেটাই দেখার বিষয়। মুন্দিয়ালের এক অপ্রত্যাশিত তারকা কুইনোনেস। যিনি এখন পর্যন্ত মেক্সিকোর চারটি গোলে অবদান রেখেছেন; আর একটি গোল বা অ্যাসিস্ট করলেই এক বিশ্বকাপে জাতীয় দলের নতুন রেকর্ড গড়বেন তিনি।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সব প্রতিযোগিতা মিলে ৯বার মুখোমুখি হয়েছে মেক্সিকো। যেখানে থ্রি লায়ন্স ৬টি জয়, ১টি ড্র এবং ২টি পরাজয়ে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখেছে। আর এসব ম্যাচে এল ট্রি-কে ২৩ গোল দেয়ার বিপরীতে ৪ গোল হজম করতে হয়েছে ইংল্যান্ডকে।