একপাশে জীবন-মৃত্যুর লড়াই অন্যপাশে পলিথিনে মোড়ানো মলিন ইফতার

মিটফোর্ডের ইফতার

Printed Edition
back-3
মিটফোর্ড হাসপাতালে ইফতারের প্রস্তুতি : নয়া দিগন্ত

হাবিবুল বাশার

শহরের মোড়ে মোড়ে যখন বাহারি ইফতারের সুগন্ধ, রেস্তোরাঁগুলোতে যখন উৎসবের আমেজ, ঠিক তখনই স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালের করিডোরে জেঁকে বসে আছে এক ভিন্ন বিষণœতা। এখানে ইফতার মানে আনন্দ নয়; বরং প্রিয়জনের প্রাণ ফিরে পাওয়ার আকুতির মধ্যে একচিলতে তৃষ্ণা মেটানো।

রোগীদের নীরব আর্তনাদ : রমজানের অন্য রূপ : পবিত্র রমজান মাস রহমতের হলেও হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা রোগীদের জন্য এটি এক চরম পরীক্ষার সময়। হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে ঢুকলেই চোখে পড়ে অসুস্থতার যাতনা। কেউ তীব্র ব্যথায় কাতরাচ্ছেন, কেউবা নাকে নল লাগানো অবস্থায় ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন জানালার দিকে।

একজন রোগী আক্ষেপ করে বলেন, ‘বাড়িতে থাকলে আজ পরিবারের সবার সাথে বসে ইফতার করতাম। এখানে ইফতারের সময় হলে আজানের ধ্বনি কানে আসে ঠিকই; কিন্তু ডাস্টবিনের দুর্গন্ধ আর ওষুধের কটু গন্ধে সব ম্লান হয়ে যায়।’ অনেক রোগী রোজা রাখার প্রবল ইচ্ছা থাকলেও শারীরিক অসুস্থতা আর কড়া ডোজের ওষুধের কারণে তা পারেন না। এই না পারার বেদনা তাদের মানসিকভাবে আরো ভেঙে ফেলে। ডায়ালাইসিস বা স্যালাইন চলাকালীন সময়ে পাশের স্বজন যখন পানি মুখে দেয়, তখন অনেক রোগীর চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে নোনা জল। ধর্মীয় বিধান ও শয্যাপাশের বিড়ম্বনা

ইসলামিক বিধান অনুযায়ী, অসুস্থ অবস্থায় রোজা শিথিল করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন : ‘তবে তোমাদের মধ্যে যে অসুস্থ অথবা মুসাফির, তাকে অন্য সময়ে এই সংখ্যা (রোজা) পূরণ করে নিতে হবে।’ (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত : ১৮৪)

ধর্মীয় এই শিথিলতা থাকলেও হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা মানুষগুলোর মনে একধরনের শূন্যতা কাজ করে। একপাশে অক্সিজেন সিলিন্ডারের শোঁ শোঁ শব্দ, অন্যপাশে আজানের অপেক্ষায় থাকা তৃষ্ণার্ত স্বজন, এ যেন এক অন্য জগৎ।

রোগীতে ঠাসা হাসপাতাল : অপ্রতুল আয়োজন

স্বাস্থ্য অধিদফতর (ডিজিএইচএস) এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মিটফোর্ড হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা প্রায় ৬০০ হলেও প্রতিদিন এখানে চিকিৎসা নেন প্রায় এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ জন ইনডোর রোগী।

হাসপাতাল কর্মচারী সূত্রে জানা গেছে, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী শুধু নিবন্ধিত রোগীদের জন্য তিনবেলা খাবারের ব্যবস্থা থাকে; কিন্তু রোগীদের সাথে আসা হাজারো স্বজনের জন্য ইফতারের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বরাদ্দ নেই। ফলে হাসপাতালের মেঝেতে বা করিডোরে বসে ইফতার করাই তাদের একমাত্র ভরসা।

‘সাধারণ’ ইফতার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ভাষ্য

হাসপাতালের গেটে কথা হয় স্বজনদের সাথে। তাদের ইফতারের মেনু অত্যন্ত সাধারণ।

মুড়ি ও ছোলা : পলিথিনে মোড়ানো একমুঠো নরম হয়ে যাওয়া মুড়ি আর সামান্য ছোলা ভুনা।

ভাজাপোড়া : কয়েকটা ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া পেঁয়াজু আর আলুর চপ।

পানীয় ও ফল : এক গ্লাস সাধারণ পানি বা লেবুর শরবত।

হাসপাতালের সামনের ক্ষুদ্র ইফতার বিক্রেতারা জানান, এখানে কেনাবেচা খুব একটা জমজমাট হয় না। একজন বিক্রেতা বলেন, ‘এখানে যারা কেনে তারা শখ করে কেনে না, পেটের দায়ে কেনে। রোগীর পেছনে সব টাকা খরচ করে ফেলা মানুষগুলো নিজের জন্য বেশি খরচ করতে পারে না।’

মিটফোর্ড হাসপাতালের বারান্দায় যখন আজানের সুর ভেসে আসে, তখন দেখা যায় এক অদ্ভুত দৃশ্য। কেউ হয়তো ড্রিপের স্ট্যান্ড ধরে বসে আছেন, কেউবা হাসপাতালের মেঝেতে সংবাদপত্র বিছিয়ে পরম তৃপ্তিতে এক ঢোক পানি পান করছেন। প্রিয়জনের সুস্থতার প্রার্থনাই সেখানে প্রধান ইফতারি। এই মানুষগুলোর কাছে ইফতার মানে পেট ভরে খাবার নয়; বরং প্রিয়জনকে সুস্থ দেখার একবুক আশা।