ভ্র ম ণ গ দ্য
সাগরকন্যা কুয়াকাটা : নীল-কমলার আলোর দেশে স্বপ্নযাত্রা
অরূপ পালিত
Printed Edition
বাংলাদেশের দক্ষিণ সীমান্তে, বঙ্গোপসাগরের তীরে দাঁড়িয়ে আছে এক মোহনীয় স্থান-সাগরকন্যা কুয়াকাটা। এই সৈকতে প্রকৃতি যেন তার সব রূপ, রস ও রঙ ঢেলে দিয়েছে। একই সমুদ্রতটে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার মতো-বাংলাদেশের এমন অনন্য সৌভাগ্য আর কোথাও নেই। যেন প্রকৃতি নিজেই এখানে এক স্বপ্নের মঞ্চ সাজিয়েছে, যেখানে আকাশ, পানি, আলো আর বাতাস মিলে গেঁথে দিয়েছে এক জীবন্ত কবিতা।
অনেকের মুখে শুনেছি এই সাগরকন্যার মোহনীয় রূপের কথা। আমারও মনে কিছু দিন ধরে অদ্ভুত এক অস্থিরতা কাজ করছিল। সাধারণত আমাদের চট্টগ্রামের লোকেরা বাইরের ডিস্ট্রিকে তেমন ভ্রমণ করেনা বললেই চলে। আর লঞ্চের নাম শুনলে মনের ভেতরে আরো ভয়ে কাজ করে। কিন্তু আমার মন চাইছিল একটু ঘুরতে- নোনা হাওয়া গায়ে মেখে সমুদ্রের গর্জন শুনতে। আর পদ্মা সেতু হওয়ার পর শুনেছি, দক্ষিণের জেলাগুলোর উন্নয়নে পথ-ঘাটের চেহারা অনেক বদলে গেছে। তাই ভাবলাম, চোখে না দেখলে বিশ্বাস হবে না।
স্বপ্নের যাত্রা শুরু :
রাত ৮টার দিকে গরীবুল্লাহ শাহ মাজারের সৌদিয়া কাউন্টার থেকে পটুয়াখালীগামী বাসে উঠলাম। এসি/নন এসি দুটো বাস আছে ওদের। আমি মুক্ত হাওয়া গায়ে মাখতে নন এসিতে উঠলাম। রাতের বাতাসে ছিল হালকা শীত, আর জানালার বাইরে অন্ধকারে জেগে থাকা ছোট ছোট দোকানের আলোয় মনে হচ্ছিল শহর ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ছে। আমি জানতাম, এই যাত্রা শুধু নতুন জায়গা দেখার নয়, নিজের ভেতরের ক্লান্ত মানুষটাকেও নতুন করে আবিষ্কার করার এক পথ।
পাগলার মোড় থেকে যাত্রার নতুন সঙ্গী : ভোরের আলো ফোটার কিছু পর বাস এসে থামে পটুয়াখালী পাগলার মোড়ে। চারপাশে সকালের বাজারের কোলাহল, চায়ের দোকান থেকে ভেসে আসছে ভাপ ওঠা দুধচায়ের গন্ধ। পটুয়াখালী ব্রিজটা হুবহু আমাদের চট্টগ্রামের কর্ণফুলীর নতুন ব্রিজের মতো। এখানেই নামার উদ্দেশ্য ছিল আমার মেয়েকেও সাথে করে নেবার। সে এখানের পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পবিপ্রবি) পড়ে। তাকে নিয়ে রওনা দিলাম কুয়াকাটার পথে।
লোকজন বলল, বরিশাল-পটুয়াখালীর লোকাল বাসগুলো খুব ধীর আর ঝাঁকুনিময়, তাই সরাসরি কুয়াকাটাগামী বাস ধরাই ভালো। আমরা তাই করলাম। কিন্তু পথে-পথে খুব বিরক্তিকর ব্যাপার হলো। এমন সুন্দর বাস লোকাল হয়ে গেল। ২ ঘণ্টার পথ ৩ ঘণ্টায় এনে শেষ করাল। তবুও ভালোলাগার ব্যাপার হলো চারদিকে সবুজ আর সবুজ ভরপুর। ক্লান্ত পথ যেন চোখের পলকে কেটে গেল। যতই এগোচ্ছে গাড়ির জানালা দিয়ে দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল ঝাউবন-বাতাসে লবণাক্ত গন্ধ, আর ঢেউয়ের মৃদু গর্জন। গাড়ি যখন থামলো, সেই শব্দ তত স্পষ্ট হচ্ছে- ঢেউয়ের শব্দ! মনে হচ্ছিল সাগর নিজেই ডাকছে তার নীলচে কোলের কাছে। মন তখন ছুটছে ঢেউয়ের দিকে, নিঃশব্দ উত্তেজনায় কাঁপছিল বুক।
নামের পেছনের ইতিহাস ‘কুয়া’- থেকে কুয়াকাটা : কুয়াকাটার নাম শুনে সবসময় ভাবতাম, এর মানে কী? এখানে এসে জানলাম, ‘কুয়াকাটা’ শব্দটি এসেছে ‘কুয়া’ বা কূপ থেকে।
আঠারো শতকে আরাকান রাজ্যের কিছু রাখাইন অধিবাসী মোগলদের অত্যাচার থেকে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয় এ অঞ্চলে। তখন চারপাশে ছিল ঘন বন আর পানির তীব্র অভাব। বাঁচার তাগিদে তারা অসংখ্য কুয়া খনন করে। সেই কুয়াগুলোর নামেই জায়গাটির নাম হয় কুয়াকাটা, অর্থাৎ ‘যেখানে কুয়া খনন করা হয়েছিল’। এই ইতিহাস যেন এখনো বেঁচে আছে এখানকার বাতাসে। রাখাইন জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, পোশাক, হাসিমুখ- সবকিছুতেই মিশে আছে সেই অতীতের স্মৃতি।
প্রথম দেখাতেই প্রেম : যখন প্রথম কুয়াকাটা সৈকতের সামনে দাঁড়ালাম, নিঃশব্দে থমকে গেলাম। দিগন্তজোড়া বালুচর-প্রায় দশ কিলোমিটার বিস্তৃত, সামনে নীলচে ঢেউ, পিছনে সবুজে-সবুজ কাঁটা কসই, সুন্দরী দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি যেন এখানে তার তুলিতে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর চিত্র আঁকছে। সকালের নরম আলোয় বালির উপর ছায়া পড়ে, ঢেউ এসে ছুঁয়ে যায় পা। বাতাসে মিশে থাকা নোনার গন্ধ যেন হৃদয়ে মাদকতা ছড়িয়ে দিচ্ছিল।
একজন ফটোগ্রাফার এসে বলল, ‘ভাই, ছবি তুলেন, প্রতি পিস পাঁচ টাকা! হেসে বললাম, ‘এই দৃশ্যটা ক্যামেরায় নয়, চোখে রাখব।’ দূরের সূর্যের আলোয় সমুদ্র যেন সোনালি হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছিল, জীবনের সব ক্লান্তি গলে যাচ্ছে এই সাগরকন্যার আলিঙ্গনে।
লাল কাঁকড়ার রাজ্য-লেম্বুর চর : ৩টার দিকে আমরা গেলাম লেম্বুর চরে। এই জায়গাটির খ্যাতি লাল কাঁকড়ার জন্য। টিভিতে ও ইউটিউবে তাদের নাচ দেখেছি, কিন্তু চোখের দেখা অভিজ্ঞতা হবে অন্যরকম।
আমি আমার মেয়েদের নিয়ে অটোতে চেপে বসলাম আসা-যাওয়া পাঁচশত টাকা। রাস্তা তেমন ভালো না এখনো কাজ ছলমান। মনে-মনে ভাবতে লাগলাম-সামনে দেখতে পাবো লাল কার্পেট বিছানো! হাজার হাজার ছোট ছোট কাঁকড়া। সূর্যের আলোয় একসাথে ছুটছে, বালুর ওপর যেন রঙিন উৎসব শুরু হয়েছে।
তবে দুঃখের বিষয়-আজ সেই সৌন্দর্যের অনেকটাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে আমাদের অজ্ঞনতায়। গাড়ির শব্দ, প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট-সব মিলিয়ে তাদের আবাস ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। যেখানে একসময় হাজারো কাঁকড়া ছিল, এখন সেখানে দেখা মেলে হাতে গোনা কয়েকটি কাঁকড়া। মনে হচ্ছিল, আমরা মানুষ নিজের আনন্দে প্রকৃতিকে কত সহজেই আঘাত করি! ফেরার পথে দেখা হলো জেলে পল্লী, যেখানে জেলেরা মাছ ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। দেখলাম বিশাল শুঁটকি মার্কেট। পরিবার থেকে বলা হয়েছিল আসার পথে শুঁটকি আনতে।
মানুষ, সংস্কৃতি ও উৎসব : কুয়াকাটা শুধু সৈকতের নয়, মানুষের গল্পও বটে। এখানে রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষ এখনো তাদের ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রেখেছে-রঙিন স্কার্ট, কাঠের ঘর, আর হাসিমুখের স্বাগতভঙ্গি যেন এক অব্যক্ত উষ্ণতা ছড়িয়ে দেয়।
শুনেছি বছরে দু’বার-শপূর্ণিমা ও মাঘিপূর্ণিমা-উপলক্ষে এখানে অনুষ্ঠিত হয় ধর্মীয় উৎসব। হাজারো হিন্দু-বৌদ্ধ তীর্থযাত্রী সমবেত হন সাগরকন্যার কোলে। ভোরে সমুদ্রে নেমে তারা পবিত্র স্নান করেন, প্রদীপ জ্বালান, প্রার্থনা করেন শান্তির জন্য। সেই দৃশ্য যেন এক অন্য পৃথিবী-সাগরের ঢেউয়ের সাথে মানুষের বিশ্বাসের মিলন।
কী দেখবেন : সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত ছাড়াও ফাতবার বন, গঙ্গামতির চর, রাখাইন পল্লী, বৌদ্ধ মন্দির, শুঁটকি পল্লী এবং তিন নদীর মোহনা।
সোনালি সন্ধ্যার জাদু : শেষ বিকেলের আলো নরম হতে শুরু করল। দিগন্তজোড়া আকাশ তখন লালচে কমলা রঙে রাঙা। সূর্য ধীরে ধীরে সমুদ্রের বুক ছুঁয়ে নেমে যাচ্ছে, আর ঢেউ এসে তীরে আছড়ে পড়ছে মৃদু স্বরে। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম। চারপাশে বাতাসে ভাসছে নোনাজলের গন্ধ, কানে বাজছে ঢেউয়ের ছন্দ। মনে হচ্ছিল, সাগর যেন দিনের শেষ গান গাইছে, আর আমি যেন তার একমাত্র শ্রোতা।
সেই মুহূর্তে আমার মনে হলো-ভ্রমণ মানে শুধু জায়গা দেখা নয়। বরং নিজেকে নতুনভাবে দেখা, প্রকৃতির মধ্যে নিজের ক্ষুদ্রতাকে অনুভব করা।
এমন দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছিল, আবারো কাল পৃথিবী নতুন করে জন্ম নেবে। সেই মুহূর্তে আমি হয়তো নাও থাকতে পারি। আজ মনে হচ্ছিল-পুরো মহাবিশ্ব আমার চারপাশে নিঃশব্দে হাসছে।
ফেরার পথে সাগরের আহ্বান : যখন ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, মনটা অদ্ভুত ভারী হয়ে উঠল। সৈকত যেন চোখে আঙুল দিয়ে বলছিল ‘এভাবে চলে যেও না।’
বাস চলতে শুরু করল, আর জানালার বাইরে সাগর ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছিল দিগন্তে। ঢেউয়ের গর্জন ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে এলো, তবুও মনে হচ্ছিল, কোথাও না কোথাও সেই ডাকটা এখনো বাজছে- ‘আবার এসো।’
পরিশিষ্ট : কুয়াকাটা আমার কাছে শুধু একটি ভ্রমণস্থান নয়, এটি ছিল এক স্বপ্নযাত্রা, এক মনের পরিশুদ্ধি। এখানে দাঁড়িয়ে বুঝেছি-আমরা যত বড় ভাবি নিজেকে, প্রকৃতির কাছে আমরা তত ক্ষুদ্র। ঢেউয়ের প্রতিটি শব্দ, সমুদ্রের কান্না বাতাসের প্রতিটি গন্ধ আমাকে শিখিয়েছে-ভ্রমণ মানে কেবল দেখা নয়, অনুভব করা।
তাই আমি এখন নিঃসন্দেহে বলতে পারি-কুয়াকাটাকে ‘সাগরকন্যা’ বলা কোনো উপমা নয়, এটি এক গভীর ভালোবাসার নাম। যে একবার এখানে এসেছে, তার হৃদয়ে চিরকাল বাজবে ঢেউয়ের সেই মধুর আহ্বান- ‘ফিরে এসো, আমার ঢেউয়ের কাছে।’